
#বুক_রিভিউ
বইয়ের নাম:অর্ধবৃত্ত
লেখক:সাদাত হোসাইন
ঘরানা:সমকালীন উপন্যাস
প্রথম প্রকাশ:ফেব্রুআরি ২০২০
প্রকাশনী:অন্যধারা
মূদ্রিত মূল্য:৫৯০৳
ব্যক্তিগত রেটিং:৯/১০
সম্পর্ক যদি কোন বিন্দু হয়,তাহলে জীবন হলো সেই বিন্দুকে ঘিরে ঘুরতে থাকা এক বৃত্ত।কিন্তু জীবন নামের সেই বৃত্ত কখনো পরিপূর্ণ হয় না,রয়ে যায় অর্ধবৃত্ত হয়ে।
"অর্ধবৃত্ত" উপন্যাসে সাদাত হোসাইন শুনাতে চেয়েছেন জীবন নামের সেই অর্ধবৃত্তের গল্প,সম্পর্ক এবং তার অদ্ভুত টানাপোড়নের গল্প।
"অর্ধবৃত্ত" বেশ বড় পরিসরের উপন্যাস হলেও উপন্যাসটির কাহিনী মূলত আবর্তিত হয়েছে একটি পরিবার এবং সেই পরিবারের সদস্যদের জীবন এবং জীবনসংশ্লিষ্ট মানুষগুলোকে কেন্দ্র করে।
প্রত্যেকটি মানুষের কাছে ন্যায় এবং অন্যায় এর একটি সতন্ত্র সংজ্ঞা আছে। মুনিয়া তাই তারচেয়ে প্রায় দুই দশকের ছোট রাফির সাথে একটি অসম সম্পর্কে জড়িয়ে পরার পরেও সেটাকে অন্যায় এর তালিকায় ফেলতে পারে না।সমাজের এথিক্স,মোরালিটি এই ধরণের সম্পর্ক বিরোধী তা জেনেও মুনিয়া সম্পর্কটাকে টানতে থাকে কারণ তার বুকের ভিতরের যে গভীর নিঃসঙ্গতা,গভীর দুঃখ তা এই সমাজ জানে না,বুঝে না,জানে কেবল একলা সে।
প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী মুনিয়া বাড়ির দায়িত্বশীল মেজোবউ,ঋদ্ধির মা,প্রভাবশালী একটি ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের প্রধান শিক্ষক।তবু রাফির কাছে এলে সে যেন হয়ে উঠে নব্য প্রেমে পরা ষোড়শী কিশোরী,অভিমানি এক প্রেমিকা।আদতে প্রবল ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়ানক নিঃসঙ্গ মুনিয়া রাফির কাছে এলে আর কিছু লুকিয়ে রাখতে পারে না,অকপটে প্রকাশ পেয়ে যায় তার ভেতরের সমস্তকিছু।
আর রাফিও যেন এক ক্ষ্যাপাটে পাগল প্রেমিক।রাতের পর রাত মুনিয়াদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থেকে তাকে কবিতা শুনিয়ে যায়-
"আমি একদিন নিখোঁজ হবো,উধাও হবো রাত প্রহরে
সড়কবাতির আবছা আলোয় খুঁজবে না কেউ এই শহরে"
মুনিয়া-রাফির এই অদ্ভুত সুন্দর বোঝাপড়া আর রোমান্টিসিজমের জন্যই হয়তো আপাতদৃষ্টিতে সমাজের মোরালিটির বিরুদ্ধগামী এই সম্পর্কটাও পাঠককে আকর্ষণ করতে থাকবে সমস্ত উপন্যাস জুড়ে।
"অর্ধবৃত্ত"-কে কেবল মুনিয়া-রাফির অসম প্রণয়গাথার গল্প ভেবে থাকলে ভুল করবেন। "অর্ধবৃত্ত" আপনাকে জানাবে জীবন কেন অর্ধবৃত্ত,জীবন কেন এবং কিসের অভাবে পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনা।
সাদাত হোসাইন এর স্বার্থকতা এই যে তাঁর উপন্যাসের কোন অপ্রধান চরিত্রও যেকোন মুহূর্তে হয়ে উঠতে পারে প্রধান।জীবনের গল্পে যেমন কোন চরিত্রই অপ্রধান নয়,আপন সত্তায় সতন্ত্র হয়ে উঠে জীবন গল্পের প্রত্যেকটি চরিত্র,ঠিক তেমনি "অর্ধবৃত্ত" কেবল মুনিয়া,রাফি কিংবা মুনিয়ার স্বামী জাফর কেন্দ্রিক হয়েই থাকেনি সেখানে বারংবারই প্রধান্য পেয়ে গেছে সেলিনা,দিপু,সুমি,ঋদ্ধি,আশফাক,হাফসা এবং নাবিলা,নাদিয়া,শফিকের মত চরিত্রেরা।প্রধান্য পেয়েছে চরিত্রগুলোর আবেগ,ভালোবাসা এবং বেদনারাও।
"অর্ধবৃত্ত"-এক মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দের গল্প। সদ্য কৈশোরে পা দেয়া মুনিয়ার মেয়ে ঋদ্ধির রাফির প্রতি স্বভাবসুলভ তীব্র আকর্ষণ উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ চরমে নিয়ে যায়।মা-মেয়ের এই "একই পছন্দের" ভয়ংকর সত্যটা ঋদ্ধি কিছুই টের না পেলেও,ভালোভাবেই টের পেতে থাকে মুনিয়া।
ভালোবাসা যে কি তীব্র বেদনা বুকে পুষে রাখার নাম তা লেখক নিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন শফিক আর নাদিয়ার একে অপরকে ভালোবেসেও ভালোবাসতে না পারার প্রচন্ড তৃষ্ণায়।
উপন্যাসজুড়ে নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হওয়া সেলিনার শেষের দিকে দিপু,নাদিয়ার জন্য হাহাকারটা যেন বুঝিয়ে দেয় জীবন গল্পের সকল নেতিবাচক চরিত্রও কেবল নেতিবাচক নয়,ইতিবাচকতার একটুকু ছোঁয়া লুকিয়ে থাকে প্রত্যেকটা মানুষের বুকের ভেতর।যেমন লুকিয়ে ছিল সেলিনা,মছিদা বেগমদের ভেতরেও।
একটা জীবনের গল্প যেমন এক বৈঠকে বলা সম্ভব নয়,তেমনি "অর্ধবৃত্তের" গল্প একটা লেখায় উপস্থাপন করা অসম্ভব।অসংখ্য ছোট ছোট আবেগ অনুভূতির সংকলন এই "অর্ধবৃত্ত" পাঠককে বারবার ভাবতে বাধ্য করবে জীবন নিয়ে,এক জীবনে পুষে রাখা সুতীব্র হাহাকার নিয়ে,ন্যায় এবং অন্যায় এর সংজ্ঞা নিয়ে,ভালো মানুষদের ভিতরের খারাপটুকু আবার খারাপ মানুষদের ভিতরকার ভালোটুকু নিয়ে।
"অর্ধবৃত্ত" নামক জীবন কে জানার এই সফরে আপনাকে স্বাগতম।
Happy reading!💝
বইটি রিভিউ করেছেন, Propa Zaman
0 Comments