বই: সাতকাহন (অখণ্ড)
লেখক:সমরেশ মজুমদার
ঘরানা:উপন্যাস
প্রকাশনী :আনন্দ পাবলিশার্স লিমিটেড
মুদ্রিত মূল্য :৯৫০ টাকা [ইন্ডিয়ান প্রিন্ট]
প্রথম প্রকাশ:১লা বৈশাখ,১৩৯৭ বঙ্গাব্দ
বাংলা সাহিত্যের এক অমর সৃষ্টি সমরেশ মজুমদার রচিত উপন্যাস 'সাতকাহন'। এই উপন্যাসে লেখক এক নারীর অপ্রতিরোধ্য জীবন-সংগ্রামের চিত্রায়ণ ঘটিয়েছেন।সাতকাহন উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র - দীপাবলী বন্দোপাধ্যায়। সুতরাং বলাই যায়, উপন্যাসটির সূচনা,প্রবাহধারা এবং পরিসমাপ্তির সম্পূর্ণটা জুড়েই আমরা 'দীপাবলি' নামের নারী চরিত্র কে দেখতে পাবো।
আংড়াভাসা নদীর তীরের এক চা-বাগানে প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠে দীপা। বাবা-মা-দুই ভাই আর ঠাকুমা কে নিয়ে আনন্দেই দিন কাটছিলো দীপার।তখনো সে ছিলো একজন সাধারণ,দুরন্ত ,চপল বালিকা।ধীরে ধীরে বালিকা দীপাবলি কৈশোরে পদার্পণ করতে থাকে।ঠিক তখনই জীবনের জটিলতা, কঠোর বাস্তবতা কিংবা পৃথিবীর অপ্রিয় সত্যিগুলোর সাথে তার পরিচয় ঘটতে শুরু করে।একটা সময় সে জানতে পারে, যে পিতা 'অমরনাথ' আর মমতাময়ী মাতা 'অঞ্জলি' তাকে ছোট থেকে বুকে আগলে রেখেছে,পরম মমতা আর ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছে তারা তার জন্মদাতা পিতা-মাতা নন।সেই থেকে শুরু, এরপর ক্রমাগত অন্তহীন ঝড়, বহু বাধা-বিপত্তি, নিষ্ঠুরতা-নির্মমতার সম্মুখীন হতে হয়েছে দীপাবলি কে।তবুও হাল ছাড়েনি দীপা, নিজের ভেতরে জমে থাকা প্রবল জেদ আর ইচ্ছাশক্তির আলো দিয়ে জীবন সংগ্রামে বারবার জয়ী হয়েছে।আর এই জয়ী হবার পেছনে যাঁর উপদেশ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে কিংবা আশার আলো দেখিয়েছে তিনি দীপাবলির 'সত্যসাধন মাস্টারমশাই'। তাঁর বাণী, অমরনাথের ভালোবাসা,আর ঠাকুমা মনোরমার আশির্বাদ ছিল দীপাবলির চলার পথের পাথেয়।সকল শুভশক্তির জোরেই মাত্র ৭২ ঘণ্টার অভিশপ্ত বৈবাহিক জীবনের কালো অধ্যায়ের স্মৃতিগুলো মুছে দিয়ে ১০ বছর বয়সী ছোট্ট দীপাবলি হয়ে ওঠে একজন অসামান্যা নারী, ক্রমান্বয়ে চোখের রেখায় আঁকা স্বপ্নগুলো সত্যি করে তুলতে থাকে। ছোট্ট গ্রামে বেড়ে ওঠা দীপাবলি জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়ে ভারতবর্ষের একজন সফল সরকারী চাকুরীজীবি হতে সমর্থ হয়।তবে কালের গর্ভে একটাসময় হারিয়ে যায় তার খুব প্রিয় মানুষগুলো। জীবনে সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হলেও প্রকৃত ভালোবাসার অভাব দীপাবলির জীবনে কিছুটা রয়েই গিয়েছিল।অতুল,অসীম,অমল,শমিত,অর্জুন কিংবা অলোক কেউই দীপাবলি কে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে পারেনি অথবা চায়নি। শেষমুহুর্ত পর্যন্ত দীপাবলি বড্ড একা হয়ে বেঁচেছিলো, আপন বলতে শুধু ঠাকুমা মনোরমাই পাশে ছিলো।
প্রিয় উক্তিসমূহ:
১."You must remember that you are fighting against your destiny. "
২."স্বাধীনতার জন্য যোগ্য হতে হবে তারপর বাইরের স্বাধীনতা আদায় করতে হবে।"
৩."চোখের এক ফোঁটা জল,একশো ফোঁটা রক্তের চেয়েও দামী।"
৪."যে নিজের চোখের জল ফেলে না,অথচ ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত হয় তার কষ্ট সবাই বুঝতে পারে না।"
৫."মরে যাওয়া মানুষ জীবিতদের মনে যে প্রতিক্রিয়া রেখে যায় তার দায় বইতে হয় অনেকদিন কারো কারো ক্ষেত্রে সারাজীবন।"
৬."মানুষের পায়ের তলায় শেকড় আছে।পুরনো জায়গা থেকে শেকড় তুলে নিতে তার যেমন বেশি সময় লাগেনা তেমনি নতুন জায়গায় সেই শেকড় বসে যেতেও দেরি হয় না।"
দীপাবলি সেই নারী যে নারীর আপোষহীন এবং দৃঢ়চেতা মনোভাবকে পুরুষশাসিত সমাজ কোনোভাবেই পরাস্ত করতে পারে না,হতাশার কালকুঠুরিতে ছুড়ে ফেলতে পারে না!দীপাবলিরা বারবার বিজয়ের মালা গলায় জড়িয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকে, বেঁচে থাকতে শেখায়। তাইতো,প্রতিটি বাঙালি নারী বুকে অফুরান সাহস আর ইচ্ছাশক্তি নিয়ে চোখের রেখায় একজন দীপাবলি হবার স্বপ্ন আঁকে।এই উপন্যাস নারীকে ভাবতে শেখাবে, জানতে শেখাবে,বাঁচতে শেখাবে,অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে শেখাবে ;সেইসাথে শেখাবে মানবিকতা।শুধু তাই নয়,এই উপন্যাস পুরুষকে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাবে,উদ্বুদ্ধ করবে বৈষম্যহীনতায়।
এই সমাজ বৈষম্যহীন হোক, মানবিকতায় ভরে উঠুক।নারী কিংবা পুরুষ নয় মনুষ্যত্ব-ই হোক প্রকৃত পরিচয়। শুভ পঠন!
বইটি রিভিউ করছেন:শাহিন হক

0 Comments