#Lost_City_Of_Atlantis
লেখক:শাহরিয়ার হাসান
পর্ব-১
আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ শিপ এ. কে. সেভেনে ভেসে এলো। ক্যাপ্টেন জুলবার্গ দ্রুত জাহাজের কিনারায় এসে নীলচে জল রাশির দিকে তাকালেন। উত্তাল সমুদ্রে বিশালাকার ঢেউ উঠছে। সেই সাথে আকাশে সারিসারি কালো মেঘের রাশি আগাম ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
_ “ক্যাপ্টেন, বাহিরে থাকাটা নিরাপদ নয়। ঝড় উঠতে চলেছে।’’ ক্যাপ্টেন জুলবার্গের পেছনে দাঁড়িয়ে কথাটা বলল রবার্ট। ক্যাপ্টেন জুলবার্গ ডান দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে উপর থেকে নিচে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন।
নিজ কেবিনের দিকে হেঁটে যেতে লাগলেন ক্যাপ্টেন। আচমকা তিনি মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেলেন। রবার্ট পিছন ঘুরে নিজ কেবিনে যাওয়ার জন্যে পা বাড়ালো। সে হঠাৎ ধপ করে কিছু পড়ার শব্দ পেয়ে পেছন ফিরে তাকাল।
_ “ক্যাপ্টেন!’’ চিৎকার দিলো রবার্ট।
.
.
জ্ঞান ফিরে জুলবার্গ নিজেকে কেবিনে পেল। তার পাশে রবার্টসহ বাকিরা বসে আছে।
_ “ক্যাপ্টেন, হঠাৎ করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন যে? শরীর কি দুর্বল?’’ প্রশ্ন করল রবার্ট।
_ “না, তেমন কিছু না। শরীর ঠিকাছে, কিন্তু আচমকা জ্ঞান কেন হারিয়ে ফেললাম নিজেও বুঝলাম না। মনে হলো যেন আচমকা আমার মস্তিষ্কে বরফ জমে গেছে। যাই হোক, সমুদ্রের শীতল হাওয়ার প্রভাবে হয়তো এটা হয়েছিল। তোমরা যাও নিজ নিজ কাজ করো। আমি একটু পর আসছি।’’
_ “সমস্যা নেই ক্যাপ্টেন আপনি বিশ্রাম নিন। আমরা জাহাজ সামলাতে পারব। আর ছয়-সাত ঘণ্টা লাগবে বন্দরে পৌঁছতে।’’
ক্যাপ্টেন আর কিছু বললেন না। একে একে সকলে উনার রুম থেকে চলে গেলেন।
.
.
_ “রবার্ট তোমাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে?’’ রবার্টকে প্রশ্ন করল চার্লস। রবার্টকে চিন্তিত অবস্থায় জাহাজের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চার্লসের মনে সন্দেহ জন্মায়। নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে যা সে সকলের কাছ থেকে লুকাচ্ছে।
রবার্ট চার্লসের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘ঝড়ের সময় অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটে গেছে। যা আমাদের সকলের দৃষ্টি থেকে আড়াল রাখতে ক্যাপ্টেন জ্ঞান হারানোর ভান করেন।’
_ “হোয়াট! রবার্ট তুমি এসব কী বলছ? ক্যাপ্টেন কেন নাটক করবেন?’’ বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করল চার্লস।
_ “চার্লস, ক্যাপ্টেন জুলবার্গ বিগত দশ বছর যাবৎ জাহাজ পরিচালনা করছেন। বছরের বেশির ভাগ সময় তিনি সমুদ্রে থাকেন, জাহাজে থাকেন। তিনি সামান্য একটা ঝড়ের শীতল হাওয়ায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলবেন? বিষয়টা অদ্ভুত না? আর তাছাড়া উনি কোনো চোটও পাননি। মাথা ঘুরিয়ে পড়লে একটু হলেই চোট পাওয়ার কথা।’’
_ “তোমার কথায় যুক্তি আছে। আচ্ছা! তুমি তোমার চোখে কি অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়েছিল?’’ প্রশ্ন করল চার্লস।
_ “হ্যাঁ! সমুদ্রের তলদেশ থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসছিল। যেন মহাজাগতিক কোনো প্রাণী সমুদ্রের তলদেশ হতে কাউকে ডাকছিল।’’
.
.
বন্দর ফেরার দু'দিন পর জুলবার্গের মৃত্যু ঘটে। আকস্মিক এই মৃত্যু জুলবার্গের সাথে সমুদ্র যাত্রায় যাওয়া প্রতিটা নাবিককে মর্মাহত করে। তবে রবার্ট কিছুতেই ক্যাপ্টেন জুলবার্গের মৃত্যুটা মেনে নিতে পাড়ল না। সুস্থ সবল একজন মানুষ আচমকা গত হয়ে গেলেন, এতে যে কারো মনেই প্রশ্ন জন্মাতে পারে। তবে রবার্ট মনে করছে ক্যাপ্টেন জুলবার্গের মৃত্যুর পেছনে সমুদ্রে উঠা সেদিনের ঝড়ের সাথে কোনো যোগসূত্র রয়েছে। এই বিষয়ে কথা বলতে রবার্ট চার্লসের সাথে দেখা করতে তার বাড়িতে যায়। চার্লসের বাড়ি বন্দরের পাশের এলাকাতেই।
_ “হেই রবার্ট, হঠাৎ কী মনে করে আমার বাড়িতে এলে?’’ খোলা দরজার প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে কথাটা বলল চার্লস।
_ “ভেতরে আসতে দেবে না?’’
_ “অবশ্যই।’’ দরজার সামনে থেকে সরে গেল চার্লস।
ঘরে ভেতর ঢুকে রবার্ট একটু আশপাশটা দেখে নিলো।
_ “হুম, ছোটো খাটো গুছালো ঘর। তুমি তো আমার মতোই অবিবাহিত তাই না?’’ আলতো হেসে বলল রবার্ট।
_ “মেয়ে জোটে না ভাই কী করব? মনে হয় চিরকুমার থাকতে হবে।’’
_ “হাসালে! তোমার মতো বলিষ্ঠ দেহের সুদর্শন পুরুষকে মেয়ে নিয়ে ভাবতে হবে না।’’
_ “আচ্ছা! তুমি বসো, আমি তোমার জন্যে কফি বানিয়ে নিয়ে আসছি।’’
.
.
কিছুক্ষণের মধ্যেই কফি নিয়ে হাজির হলো চার্লস। এক চুমুক কফি পান করে রবার্ট চার্লসকে বলল, ‘ক্যাপ্টেন জুলবার্গের…’ রবার্টকে থামিয়ে দিয়ে চার্লস বলল, ‘তোমার ধারণাটা একদম ঠিক ছিল। সেদিন আসলেই অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছিল। ক্যাপ্টেন জুলবার্গের মৃত দেহ আমি দেখেছি। উনার শরীর অস্বাভাবিক রকমের ঠাণ্ডা ছিল। আর সদ্য মৃত কোনো দেহ এত শীতল হয় না। দেহের তাপমাত্রা বলছে, তিনি দু'দিন আগেই মারা গিয়েছিলেন।’
_ “বীভৎস কিছু একটা তো ক্যাপ্টেনের সাথে ঘটেছিল। কিন্তু আমার মনে হয় না এই রহস্য উদঘাটনের কোনো পথ খোলা রয়েছে। কারণ ক্যাপ্টেন তো মারা গেছেন আর সমুদ্রের সেই ঝড়ের দেখা মনে হয় না আর মিলবে।’’ মুখটা মলিন করে কথাটা বলল রবার্ট
ঠোঁট উচকিয়ে চার্লস মাথা নাড়াল। এভাবেই কিছু সময় কেটে যায়। শেষ চুমুক কফি পান করে রবার্ট বলে উঠল, ‘এই চার্লস, ক্যাপ্টেন রোজ উনার ডাইরীতে প্রতিদিনের ঘটনাগুলো লিখে রাখতেন। আমরা মনে হয় উনার ডাইরী থেকে আমরা কিছু হলেও জানতে পারব।’
রবার্টের প্রস্তাবে চার্লস সম্মতি জানাল, ‘ডাইরীটা নিতে ক্যাপ্টেনের বাড়িতে যেতে হবে। কেবিন থেকে ক্যাপ্টেনের সকল জিনিস পত্র উনার স্ত্রীর নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।‘
_ “তো আর দেরি কিসের? চলো এখুনি বেরিয়ে পড়ি।’’
.
.
ক্যাপ্টেনের মৃত্যুতে উনার স্ত্রী পুরো ভেঙে পড়েছেন। ক্যাপ্টেনের ছোটো ছেলে উনার ডাইরী রবার্টকে দিলো। রবার্ট ডাইরীর শেষের দিকে গেল। শেষ পৃষ্ঠা সে পড়তে লাগল, ‘সমুদ্রে উঠা আজকের ঝড়টা স্বাভাবিক নয়। আমাকে সে টানছে, অন্য কোনো জগত থেকে আমাকে টানছে। মৃত্যুকে আমি দেখতে পাচ্ছি, ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসছে সে।’
ডাইরী জুড়ে শেষের দিকে আর কোনো লিখা নেই। চার্লস রবার্টের দিকে তাকিয়ে স্থির গলায় প্রশ্ন করল, ‘কার কথা বলছেন ক্যাপ্টেন?’
_ “সমুদ্রের নিচ থেকে ভেসে আসা সেই শব্দের মালিকের কথা ডাইরীতে লিখেছেন ক্যাপ্টেন।’’
.
.
সেদিনের পর থেকে রবার্ট আর চার্লস সেই রুটের আর কোনো জাহাজে নাবিক হিসেবে কাজ করেনি। অন্যান্য রুটের জাহাজগুলোতে তারা আবেদন করে নাবিক হিসেবে কাজ নিয়েছে। তারা ক্যাপ্টেন মতো নিজের জীবন হারাতে চায় না। এভাবেই তাদের কয়েক মাস কেটে গেল। তাদের স্মৃতিতে থাকা সেদিনের ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকল।

0 Comments