#Lost_City_Of_Atlantis
লেখক:শাহরিয়ার হাছান
পর্ব-২
_ “মানুষ মনে করে সময় সমুদ্রের স্রোতের মতো একদিকে প্রবাহিত হয়। তবে আমি বলব মানুষের এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। কারণ আমি সময়ের নানান রূপ দেখেছি, সময় হলো সমুদ্রে উঠা টনেডোর মতো। বায়ু আর পানির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা একটা ফাঁদ। যে ব্যক্তি সময়ের বিপরীতে চলার চেষ্টা করে, সে ব্যক্তিই এই ফাঁদে ধরা পড়ে, বন্দি হয়ে যায় সময়ের জালে।’’ রবার্ট ক্যাপ্টেন জুলবার্গের ডায়েরীর মাঝের দিকে এই লিখাটা পেয়েছে। পড়ে সে বুঝতে পাড়ল বিজ্ঞানের প্রতি ক্যাপ্টেন জুলবার্গের আলাদা একটা টান ছিল। ডায়েরীর বিভিন্ন পৃষ্ঠায় বিজ্ঞান বিষয়ক নানান তত্ত্বকথা রয়েছে। ডায়েরীটি পড়ে যে কেউই বিশ্বাস করে বসবে ডাইরীটি কোনো বিজ্ঞানীর দিনলিপি। আজ এত মাস পর হঠাৎ ক্যাপ্টেনের কথা রবার্টের মগজে উত্থিত হয়। তাই ক্যাপ্টেনের দিনলিপির ডায়েরীটি পড়তে শুরু করে। ডায়েরীর কিছু পাতা পড়ার পর রবার্ট মনে কৌতুহল বাড়তে থাকে। যত পড়ছে তত অজানা তত্ত্বকথা জানছে সে।
_ “ক্যাপ্টেন কী আগের জন্মে বিজ্ঞানী ছিলেন নাকি? এত সুন্দর করে বিজ্ঞান বিষয়ক কথাগুলো তো আমার কলেজ জীবনের স্যারেরাও বোঝাতে পারেননি। উনাদের কোনো লেকচারই আমার মগজ অবধি পৌঁছাত না , এক কান দিয়ে ঢুকত আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে যেতো। ব্যাস!’’
রবার্ট পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পরের পৃষ্ঠা পড়া শুরু করল। প্রথম লাইনে শুধু একটা শব্দ লিখা ছিল ‘Dimension’ অর্থাৎ মাত্রা। রবার্ট পড়া শুরু করল।
_ “মাত্রা সম্পর্কে কয়জনের পূর্ণ ধারণা রয়েছে? অনেকের রয়েছে কিন্তু পুরোপুরি সঠিক জানে না। আজ এই মাত্রা নিয়ে কয়েকটি বই পড়লাম। বইগুলো থেকে মাত্রা বিষয়ক অনেক কিছু জানতে পেরেছি। তাই ভাবলাম, আজ আমি ডায়েরীতে মাত্রা নিয়ে সংক্ষেপে কিছু লিখে গেলে কেমন হয়? আমার মৃত্যু পর যদি কেউ এই ডায়েরীটি পড়ে তাহলে সে কিছুটা হলেও মাত্রা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারবে। এই মুহূর্ত কেউ যদি আমার ডায়েরী পড়ে থাকো তাহলে একটা কাগজ আর কলম নেও।’’
রবার্ট দ্রুত উঠে গিয়ে একটা কাগজ আর কলম নিলো। এরপর আবার ডায়েরীর লিখা পড়তে শুরু করল।
_ “কাগজের মাঝে কলম দিয়ে একটা ফোঁটা দেও। যে বিন্দুটা তৈরি হলো সেটার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা কিছুই নেই। এখন যদি তোমার জন্ম এখানে হতো তাহলে তুমি নড়তে পারতে না, সামনে-পিছনে এবং উপর-নিচে যেতে পারতে না। এটা হলো শূন্য মাত্রা। এবার ওই বিন্দুটা থেকেই একটা সরলরেখা আঁকো, বেশি বড় আঁকতে হবে না। এই সরলরেখার দৈর্ঘ্য আছে, প্রস্থ এবং উচ্চতা নেই। যদি তোমার জন্ম এখানে হতো তাহলে তুমি সামনে আর পেছনেই যেতে পারতে। এটা হলো প্রথম মাত্রা। এবার সেই সরলরেখাটির মাপ নিয়ে একটি বর্গক্ষেত্র আঁকো। তোমার জন্ম যদি এখানে হতো তাহলে তুমি এই বর্গক্ষেত্রের মধ্যে যা ইচ্ছে করতে পারতে কিন্তু লাফ দিতে পারতে না। কারণ উচ্চতা যে নেই! এটা হলো দ্বিতীয় মাত্রা। এবার আর কাগজের প্রয়োজন নেই। তুমি তোমার আশেপাশে যতগুলো আসবাবপত্র দেখছ সবগুলোরই দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা রয়েছে। এগুলোই তৃতীয় মাত্রার বস্তু, এমনকি তোমার দেহও তৃতীয় মাত্রার। চতুর্থ মাত্রা হলো সময়, যদি তুমি সময় ভ্রমণ করতে পারো তাহলে তুমি চতুর্থ মাত্রা উপভোগ করতে পারবে। তুমি সময়ে সামনে বা পেছনে যেতে পারবে, কিন্তু ডানে-বামে নয়। পঞ্চম মাত্রায় তুমি সময়ে সামনে পিছনে এবং ডানে বামে যেতে পারবে। সময়ের ডানে বামে? এর অর্থ একই সময়ে তুমি দুই জায়গায় নিজের অস্তিত্ব কায়েম করতে পারবে। আর ষষ্ঠ মাত্রায় তুমি সময়ের যেকোনো স্থানে যেতে পারবে। যেখানে সেখানে নিজের অস্তিত্ব রাখতে পারবে। সপ্তম মাত্রায় সময় আর তোমার বাঁধা হবে না। তুমি শুধু নিজের জগত নয় অন্যান্য প্যারালাল ইউনিভার্সে ভ্রমণ করতে পারবে। এবার বুঝে নেও সপ্তম মাত্রার জীবেদের ক্ষমতা। অষ্টম মাত্রায় থিউরি বলে তোমার ভৌতিক কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। তুমি যেখানে সেখানে যেতে পারবে কিন্তু তোমার এবং তোমার জগতের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। অদ্ভুত না? নবম মাত্রার বিষয়টা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, নবম মাত্রায় একই স্থানে তোমার পাশাপাশি অন্যান্য জীবও থাকতে পারে। কিন্তু তোমার একে অপরকে দেখবে না, নিশ্চিন্তে বাস করতে পারবে। দশম মাত্রা তোমার ধারণার বাহিরে। তুমি যা ভাব্বে তার চেয়েও কোটিগুণ বেশি ঘটনা ঘটাতে পারবে। এই মাত্রার জীব বাকি নয় মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। তবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে বলব চার মাত্রা পর্যন্তই বিশ্বাস যোগ্য। কারণ বাকি মাত্রাগুলো শুধু ধারণা মাত্র। আমরা সময়ের দ্বারা প্রভাবিত হই সুতরাং চার মাত্রা অবধিই বিশ্বাস করা যুক্তিসংগত বলে আমি মনে করি। আমাদের জগত দশ মাত্রার উপর টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া আরো মাত্রা রয়েছে। সেগুলো বোঝা খুব জটিল, সত্যি বলতে আমি নিজেই বুঝিনি। ’’
ডায়েরীর পৃষ্ঠাটা রবার্টের কপাল বেয়ে পড়া ঘামে ভিজে গেল। একটা অজানা অস্বস্তি তার গলা চেপে ধরেছে। ক্যাপ্টেন জুলবার্গ কথাগুলো এমনভাবে বলেছেন যেন তিনি সত্যি সত্যিই রবার্টের সামনে বসে আছেন। রবার্টের মনে হচ্ছে ডায়েরীর পাতা থেকে চোখ ফিরিয়ে সামনে তাকালেই ক্যাপ্টেন জুলবার্গকে সামনে বসে থাকতে দেখবে, ফ্যাকাসে ঠাণ্ডা দেহ নিয়ে। ভয়ে রবার্টের হাত পা জোড়া হিমশীতল ঠাণ্ডা হয়ে গেল। নিঃশ্বাস ফেলতে তার কষ্ট হচ্ছে। যেন এখুনি সে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে। দ্রুত রবার্ট নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে নিয়ে ডায়েরীটা পাশে ছুড়ে ফেলে দিলো। নিজ আসন ছেড়ে সে দাঁড়িয়ে পড়ল, দ্রুত বিপরীত দিকে সে হেঁটে যেতে লাগল। ভিতরের রুমে এসে সে চোখ মেলল। রবার্টের এখনো মনে হচ্ছে পাশের ঘরে কেউ বসে আছে।
.
.
আচমকা রবার্টের ফোনটা বেজে উঠল। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে চেনা একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, কণ্ঠটা চার্লসের।
ওপাশ থেকে চার্লস বলে উঠল, ‘শিপ এ.কে.সেভেনের এক নাবিক আশ্চার্যজনক ভাবে মাঝ সমুদ্রে জাহাজ থেকে গায়েব হয়ে যায়। কেউ কেউ বলছে সে নাকি জলে ঝাঁপ দিয়েছিল। শিপের ক্যাপ্টেন বন্দরে পৌঁছে কর্তৃপক্ষকে বিষয়টা জানাল। মনে হয় না আর সেই নাবিককে খুঁজে পাওয়া যাবে। কারণ সে আটলান্টিক মহাসাগরে হারিয়েছে।’
ওপাশ থেকে রবার্টের গলা শুনতে না পেরে চার্লস একটু বিচলিত হলো। হন্তদন্ত হয়ে সে চিন্তিত গলায় বলে উঠল, ‘রবার্ট! তুমি ঠিকাছ তো? হ্যালো….হ্যালো। রবার্ট…. রবার্ট!’
ার্লসের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। রবার্টের কিছু হয়নি তো? দ্রুত চার্লস নিজের পোষাক পরিবর্তন করে রবার্টের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
.
.
রবার্ট চোখ মেলে একটা সিলিং ফ্যান দেখল। ঘাড় ঘুরিয়ে সে আশপাশ দেখে নিলো। হাসপাতালে সে। চার্লস তার ডান পাশে বসে আছে। রবার্ট উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু ব্যর্থ হলো। চার্লস রবার্টকে ধরে হেলান দিয়ে বসাল। রবার্ট অনুভব করল তার মাথাটা তুলনা মূলক ভারী। মাথায় হাত দিয়ে সে বুঝতে পাড়ল মাথায় ব্যাণ্ডেজ করা হয়েছে।
_ “রবার্ট, তুমি মাথায় চোট কী করে পেলে?’’ প্রশ্ন করল চার্লস।
রবার্ট একটু ভাবল, চার্লসকে সে কী কী বলবে তা মনে মনে সে গুছিয়ে নিলো।
_ “ক্যাপ্টেন জুলবার্গের ডায়েরী পড়ছিল। ডায়েরীতে লিখাগুলো এমন ভাবে ছিল যেন বাস্তবে তিনি আমার সামনে বসে কথা বলছেন। আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই, এরপর ভেতরের রুমে আসি। তখন তুমি কল দিয়ে একটা অদ্ভুত সংবাদ শুনিয়ে দিলে, আমি আর তাল সামলাতে না পেরে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাই। এরপর কী হয়েছে আমার আর মনে নেই।’’
চার্লস মাথা নাড়ল, ‘বুঝেছি! এখন তুমি বিশ্রাম নেও।’
_ “অনেক বিশ্রাম নিয়ে, এতক্ষণ তো অচেতন অবস্থায় ছিলাম। শিপে ওই নাবিকের সাথে কী হয়েছে একটু খুলে বলো।’’ বলল রবার্ট
চার্লস ধমকের সুরে বলে উঠল, ‘কথা বাড়াবে না। তুমি নিজ ইচ্ছায় অচেতন হওনি, সেটা দেহের বিরুদ্ধে ছিল। এতক্ষণের বিশ্রাম তোমার দেহের জন্যে মোটেও উপকারী ছিল না। এখন আমার কথা মতো বিশ্রাম নেও। না হলে ডক্টরকে বলে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়াব।’
রবার্ট আর কিছু বলল না, চুপচাপ চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করল।
.
.
_ “সাহারা মরুভূমি দেখি কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছে। আমার সময়ে তো সাহারা মরুভূমি এমন ছিল না। অনেক সবুজ গাছপালা ছিল কিন্তু এখন নেই বললেই চলে। শুধু কয়েকটা ক্যাট্টাস চোখে পড়ছে। সাহারা মরুভূমি আসলেই অসহায় হয়ে পড়েছে।’’ মনে মনে নিজেকে নিজেই বলল ইওন। ডান হাতে উট বাধা রশি আর বাম হাতে লম্বা একটা তলোয়ার নিয়ে ইওন এগিয়ে চলল। উটের পিঠে একটা চাপড় মেরে সে বলে উঠল, ‘এই মরুভূমি ভ্রমণের একমাত্র সঙ্গী হলি তুই। তুই না থাকলে হয়তো এতদূর আশা হতো না।’
মরুভূমির প্রায় মাঝে চলে এসেছে ইওন। আচমকা তার চোখে একটা দৃশ্য অস্বাভাবিক মনে হলো। তার থেকে কয়েক গজ সামনে বিশাল একটা গোলাকার এলাকা, যার চারিদিকে পানি। ইওন মাঝ মরুভূমিতে পানির সন্ধান পাবে তা আশা করেনি। অবশ্য তার পিপাসাও লেগেছে। উট নিয়ে সে সেই দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। পুরো মরুভূমি শান্ত হলেও উষ্ণ বায়ুর প্রভাবে ইওনের পুরো শরীর ঘেমে একাকার। সুযোগ হলে সে তার শরীর পানিতে ভিজিয়ে নেবে, এই ভেবে এগিয়ে চলেছে সে।
চলবে…..
তা মাত্রা বুঝতে কি কেউ কাগজ কলম নিয়েছিলেন?
গল্পের রহস্য বুঝতে হলে ধৈর্য্য সহকারে কয়েকটি পর্ব পড়ে যেতে হবে।
3rd part will be uploaded 20.04.20

0 Comments