বাবা



গল্প: বাবা
লেখক: আশিকুর রহমান


#
আমার নাম রিফাত। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে আমি। বাবা ছোটোখাটো একটা সরকারি জব করেন। আমরা 2 ভাই-বোন। সবেমাত্র, অনার্স 2 য় বর্ষে উঠলাম। ভার্সিটিতে একদিন খুব ভালো একটা মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব হলো। জানতে পারলাম, মেয়ের বাবা কোনো এক বড় কোম্পানির ম্যানেজার। তার সাথে আমার সম্পর্ক ভালোই চলছিলো। এভাবেই বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে আমাদের ভালো লাগা তৈরি হয় ভালোলাগা। আর, তা থেকে ভালোবাসা।


একদিন রুমে বসে পড়ছিলাম হঠাৎ দেখলাম বাবা ঘরে ঢুকল। বাবাকে বললাম,

"বাবা আমার ভার্সিটির বন্ধুরা সবাই গিয়ার সাইকেল নিয়ে ক্যাম্পাসে আসে আর আমি পুরাতন জামানার একটা সাইকেল(রাগ্বান্বিত ভাবে)।"

বাবা বললেন, 'আচ্ছা বাবা। গিয়ার সাইকেলের দাম কতো? "

আমি " মোটামুটি ধরনের কিনলে 12 হাজার হলেই হবে"।

বাবা বললেন, " আচ্ছা!  যা  পড়তে বস। আমি কালকে সকালে টাকা দিবো!"

হঠাৎ করেই আম্মু বলল,
"তুই জানিস না ? আমাদের অবস্থা  কেমন? এদিকে ঘরে সামনের মাসের চাল-ডাল নেই, তোর বাবা লোন তুলেছে সেগুলোও তো পরিশোধ করা লাগবে"।

আমি চুপ করে রইলাম।

হঠাৎ, বাবা বললেন,
" আচ্ছা থাক না! তোমার ছেলে  সাইকেল চেয়েছে আমি দিবো না? যা বাবা পড়তে বস  ।তুই কাল সকালে টাকা পেয়ে যাবি। "

এদিকে, আমি খুশিতে আত্নহারা হয়ে নিজের রূমে চলে গেলাম।

কিছূক্ষন পর, বাবা-মায়ের  রুম থেকে কথা ভেসে আসতে লাগল,

মা বলতে লাগলেন,
" তুমি যে ওকে 12 হাজার টাকা দিবা তোমার কাছে কী আছে?"

বাবা বললেন," আছে! ঔষুধের জন্য জমানো দশ হাজার আছে না? ঐ টাকা দিবোনে আর 2 হাজার বন্ধুর কাছ থেকে ধার করবোনে।"

মা বললেন," এভাবে চললে হবে? ছেলেটাকে লাই দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছো"

বাবা উত্তর দিলেন," আহা! ও এই বয়সে চাবে না তো কোন বয়সে চাবে? সামান্য সাইকেলই তো ?"

মা রাগ্বান্বিত স্বরে বললেন," আমি কিছূ জানিনা বাপু! তুমি যা করার করো"

আমি মন দিয়ে তাদের কথা শুনছিলাম আর পানি ফেলছিলাম কিন্তু, কী করার? বন্ধুরা আমাকে দেখে হাসাহাসি করে। আবার, রিয়ার সাথে প্রেম করি আমার একটা স্ট্যাটাস আছে না?


সকাল বেলা, ডাইনিং রুমে বসে নাস্তা খাচ্ছি। দেখলাম, বাবা বাহির থেকে আসলেন। এসে বললেন," এই নে বাবা! তোর 12 হাজার টাকা। সুন্দর দেখে একটা সাইকেল কিনিস"
আমি বললাম, আচ্ছা। বাবা"

বাবা কিছুক্ষন পর বললেন,
" কৌ  গো রিফাতের মা? আমার টিফিন কী রেডি হলো? দেরী হয়ে যাচ্ছে! "

মা আসলেন এবং টিফিনটা দিয়ে বললেন," এই নাও! "

বাবা বললেন," আমার ছাতাটা দাও তো। বৃষ্টি বাদলের দিন।"

মা বললেন, "কীসের ছাতা? ঐ ছেড়া ছাতাটা?"

বাবা  হেসে বললেন, "কিসের ছেড়া? মুচীর কাছে নিয়ে গেলেই ঠিক করে দেবে।"

মা একটু করুন সুরে বললেন," এবার একটা নতুন ছাতা কিনো?"

বাবা বললেন," এটাই তো নতুন। আর কী লাগে?"

একটু পর বাবা বাসা থেকে বের হয়ে গেলেন।
আমি ডাইনিংয়ে বসে সব শুনছিলাম।
বাবা ছাতাটিকে মুচীর দোকানে নিয়ে বললেন,

"করিম সাহেব? ছাতাটা একটু দেখুন তো!"

করিম সাহেব হেসে বললেন,

" আর কতো? ভাইজান? এবার একটা নতুন ছাতা কিনুন।"

"কিনবো কিনবো। ঈদের বোনাসটা পাই। তারপর কিনবো। এখন তুমি দাও তো।"

" ভাইজান! এটা ঠিক করতে সময় লাগবে আপনি বরং পরে এসে নিয়ে যাইয়েন"

এদিকে  বৃষ্টি হওয়ার কারনে আমার আজ সাইকেল কিনা হলো না। রিক্সায় করে ভার্সিটিতে গেলাম। ক্লাস করার পর রিয়ার সাথে পার্কে ঘুরতে গেলাম।  দু-জনে নিজেদের কথাগুলো শেয়ার করলাম। বললাম, জানো? বাবা আজ টাকা দিয়েছে সাইকেল কিনবো। মোবাইল বের করে বিভিন্ন সাইকেলের পিক দেখাতে লাগলাম রিয়াকে।

"আচ্ছা? কোন কালারের সাইকেলটা ভালো হবে? "

"উম. .কমলা কালারের টা কিনো খুব সুন্দর হবে।"

" আচ্ছা"

এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসায় দু-জনে বাসায় আসব  এমন সময় রিয়া বলল,

" চলো! আজকে তোমাকে বাসায় ড্রপ করে দেই । বৃষ্টি বাদলের দিন"
আমি বললাম,  "আচ্ছা ।"

এলাকার সামনে আসতেই ড্রাইভার গাড়ি থামাল। রিয়া হঠাৎ করে বলে উঠল,

" রিফাত? দেখো ঐ যে  তোমার বাবা। চলো তোমার বাবার সাথে দেখা করে আসি।"

আমিও স্পষ্ট দেখতে পেলাম, বাবা মুচীর দোকানে ছেড়া ছাতাটা নিয়ে বসে আছে। আমি বললাম,
" কৌ না তো ? ঐটা আমার বাবা না। অন্য কেউ হবে।"

আমি তড়িঘড়ি করে নেমে বললাম, আচ্ছা রিয়া যাও! আমি এখান থেকে চলে যেতে পারবো। দেখলাম রিয়া আমার দিকে রাগ্বান্বিত চোখে তাকিয়ে আছে । চলে আসার সময় কোনো কথা বলল না।

খানিকবাদে, বাসায় ঢুকলাম। দেখি আমার পর আব্বুও ঢুকল।

বাবা বললেন,"কীরে সাইকেল কিনিস নি?"

"না বাবা! বৃষ্টির কারনে সাইকেলের শো রুম বন্ধ ছিলো"

" ওহ। আচ্ছা ।"



রাতের বেলা রিয়াকে কল দিলাম। কিন্তু, সে কল ধরল না।
পরদিন বৃষ্টির কারনে ভার্সিটি যেতে পারলাম না । দুদিন পর রিয়া কল দিলো! দিয়ে বলল,

"রিফাত? তুমি আজ বিকাল 4 টায় পার্কে আমার সাথে দেখা করবে।"

আমি কোনো কথা বলার আগেই সে ফোন কেটে দিলো।
4 টা বাজার আধ ঘন্টা আগেই পার্কে গিয়েছিলাম দেখলাম আমরা যেখানে নিয়মিত বসি রিয়া সেখানে বসে আছে। ওর কাছে যেতেই বলল, "দেখো! রিফাত আমি তোমার সাথে সম্পর্ক আর রাখতে চাইনা।"

"কেন?"

" যেই  ছেলে তার বাবাকে অস্বীকার করে নিজের ইজ্জত চলে যাবে বলে সেই ছেলের সাথে আমি কীভাবে সম্পর্ক রাখব? "

"আমি সত্যি বলছি উনি আমার বাবা ছিলেননা।"

"দেখো রিফাত আমাকে শিখাতে এসো না। তোমার সাথে সম্পর্ক করার আগে তোমার সকল লাইফ হিস্ট্রি আমি জেনেছি। তুমি কী ভেবেছো? তোমার বাবা আমার বাবার থেকে কম টাকা আয় করেন বলে আমি তোমার সাথে সম্পর্ক রাখব না?  আমি তো তোমার বউ হতে চেয়েছিলাম। মনে রাখবে, কোনো কাজই ছোটো নয়। আর, তুমি? তুমি তোমার ইজ্জত বাচাতে আমার কাছে মিথ্যে বললে? কেননা, তিনি একটা মুচীর দোকানে দাড়িয়ে যার ছেড়া ছাতাটা ঠিক করছিলেন এই জন্য? তোমার তো লজ্জা হওয়া উচিত। তোমার বাবা নিজে ছাতা না কিনে তোমার জন্য সাইকেল কিনার টাকা দিয়েছেন। এমন বাবা কার ভাগ্যে জোটে? দেখো আমি আর তোমার সাথে সম্পর্ক রাখবো না"

আমি কিছু বলার আগেই রিয়া চলে গেলো।


সেদিন রাত্রে অনেক কেদেছি । আসলেই তো আমি একটা কুলাঙ্গার। যে নিজের বাবার পরিচয় দিতে লজ্জা পায়। আসলেই তো কোনো কাজ ছোটো নয়।
বেশ কদিন ডিপ্রেশনে থাকার পর বন্ধুদের বললাম,

" দোস্ত? এলাকায় একটা বিজনেস করবো। আমরা মানুষের  পুরাতন ছাতা নিয়ে তাদের নতুন ছাতা দিবো । "

বন্ধুরা বলল," তোর মাথা খারাপ?"
আমি বললাম, বেশি কথা বলিস না। থাকলে থাক না হলে নাই ।আমি একাই করব!"

"আচ্ছা। ঠিক আছে আমরা রাজি"বন্ধুরা বলল।


সেদিন থেকে, প্রতিদিন এলাকার মোড়ে মোড়ে আমরা ছাতার ব্যাবসা শুরু করি। বাবার দেওয়া 12 হাজার টাকাকে পুজি হিসেবে ধরি। আমরা, পুরাতন ছাতা গুলো রিপেয়ার করে তা বিক্রি করতাম।



এমন করে আমাদের বিজনেস ভালো চলছিলো। আর , আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান ছিলো বাবার ছাতাটি।


মাঝে মধ্যে রিয়ার সাথে কথা বলতে চাইতাম কিন্তু, সাহস ছিলো না। এদিকে, ছাতা বিক্রি করতে করতে রাত হওয়ার ফলে বাবার কাছে বকুনি খেতাম। মাকে বলত,

"তোমার ছেলে রাত করে বাসায় ফিরে। বন্ধুদের সাথে মিশে খারাপ হয়ে গেছে"।


হঠাৎ একদিন বাবার কাছে মারও খেয়েছি রাত করে বাসায় ফেরার জন্য। সেদিন তিনি জিজ্ঞাস করেছিলেন,

" তোকে যে সাইকেল কিনার জন্য টাকা দিয়েছিলাম সেই টাকা কোথায়? নিশ্চই ঐসব ফালতু বন্ধুদের সাথে কিছূ করেছিস!"( রাগ্বান্বিত স্বর)।

বাবাকে বলতে পারলাম না,যে তার সেই টাকাকে পুজি করে আজ আমি নিজের পায়ে কিছূ করছি।সেদিন, রাতে আমি রাতের খাবারও খাইনি। ফলে, বাবা আমার ওপর আরও রেগে গেলেন। কিন্তু, মাঝরাতে বাবা ভাত নিয়ে আসলেন,


" বাবা? ঘুমিয়ে গেছিস? ওঠ! খেয়ে নে। আরে, তোকে বকেছি দেখে রাগ করে আছিস? "

বাবা জানে আমে ঘুমাইনি। একটূ পর ঘাড়ে হাত দিলেন আর আমাকে টেনে তুললেন। তারপর, আমাকে ভাত খাইয়ে দিলেন। আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিলো আর মনে মনে বলছিলাম, এর নামই হয়তো বাবা।


একদিন সন্ধায় রিয়া আমাকে ছাতা বিক্রি করেতে দেখে। আমি স্পষ্ট দেখলাম তার মুখে একটা করুনার হাসি।
পরদিন, সন্ধায় রিয়া আমার বাবাকে ডেকে আনল। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে ছিলাম। বাবা কিনা কি বলবে। কিন্তু, দেখলাম বাবা একটা হাসি দিলেন।  বাবা বললেন," রিয়া আমাকে সব বলছে। তুই এখানে সাইড বিজনেস করছিস এটা আমার কাছে সত্যিই খুব ভালো লেগেছে। রিয়া আমাকে আরও বলেছে, তোরা দু-জন দুজনকে ভালোবাসিস।"

আমার আর রিয়ার মুখে একটা লজ্জার ছাপ।

কিছুক্ষন পর, বাবা দোকানে ঢুকতেই দেখলেন তার ছেড়া ছাতাটা খুব সুন্দরভাবে মুড়িয়ে রাখা আর তাতে লেখা, এটা খুব মূল্যবান। দয়া করে টাকা দিয়ে কিনতে যাবেননা।

বাবা আমাকে বললেন," এটা আমার সেই পুরাতন ছাতাটা না?"
"জ্বী। এটা আমার হাজার বছরের ভালোবাসা। কারন, এটাতে জমিয়ে রয়েছে তোমার, আমার , সবার ভালোবাসাময় স্মৃতি।"


বাবার চোখটা দেখলাম ভিজে গেলো। হঠাৎ তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি বুজতে পারলাম এটাই হয়তো পৃথিবীর সেরা মুহুর্ত ।

ভালোবাসি বাবা তোমায়!
জেমসের বিখ্যাত গানটি মনে বেজে উঠলো,
" এতো রক্তের সাথে রক্তের টান!
স্বার্থের অনেক উর্দ্ধে..."



Post a Comment

0 Comments