#Lost_City_Of_Atlantis
লেখক:#শাহরিয়ার_হাছান
পর্ব-১০
_ “যাহা রটে, তাহা কিছুটা হলেও ঘটে।’’ বলল ইওন।
_ “হ্যাঁ, তাই তো আমরা এখন এই অন্ধকার ঘরে বন্দি। তুমি শুধু বললে বহিরাগতদের বিরুদ্ধে তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের বন্দি বানানো হলো।’’ বলল ফারহান।
_ “আমরা মনে হয় কোনো যানবানহনের মধ্যে রয়েছি। এই দেখো কেমন দুলছে।’’ বলল ইওন।
ফারহান কিছু বলল না। আসলেই তারা সেখানে বন্দি হয়ে আছে সেটা দুলছে। মনে হচ্ছে কোন যানবানহনের মধ্যে রয়েছে তারা।
.
.
মিনিট দশেক পর চোখের সামনে থাকা অন্ধকার সরে গেল, অন্ধকার ভেদ করে উজ্জ্বল আলো ভেতরে প্রবেশ করল। এতে ইওনের চোখ ধাদিয়ে গেল। ফারহান বাহিরে উঁকি দিয়ে দেখল একটা জেলখানায় তারা বন্দি। সামনে লোহার রডের দরজা। তাদের থেকে ফুট কয়েক লম্বা একটা মানব এসে দরজাটা খুলে দিলো। হাতের ইশারায় সে ইওন এবং ফারহানকে বের হতে বলল। ইওন এবং ফারহান জেলখানা থেকে বের হতেই সেই মানবটি হুট করে জেলখানায় প্রবেশ করে নিজেকে নিজেই বন্দি বানালো। দৃশ্যটা দেখে ইওন হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
_ “এটা কী হলো?’’ ফারহানকে প্রশ্ন করল ইওন।
ফারহান হেসে বলল, ‘হয়তো প্রহরী বুঝতে পেরেছে তাদের রাজা আমাদের এখানে নিয়ে এসেছেন। তাই হয়তো আমাদের মুক্তি করে দেওয়া হয়েছে। আর প্রহরী ভুল করে আমাদের বন্দী করায় হয়তো রাজার ভয়ে এখন নিজেকে বন্দি বানিয়ে ফেলল।’
ইওন কিছু বলল না। সে সামনের দিকে এগিয়ে গেল, সেই সঙ্গে ফারহানও।
_ “একি!’’ বলল ইওন।
ইওন এবং ফারহানের সামনে বিশাল বড় এক মাঠ। মাঠের চারপাশে হাজারো মানুষ। যেন ফুটবল ম্যাচ শুরু হতে চলেছে। আচমকা একটা বিশালাকার কুকুর এসেছে দাঁড়াল তাদের সামনে।
ইওন বলে উঠল, ‘আমাদের মুক্তি করা হয়নি। আগেরকার যুগের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এই বিশাল কুকুরটা আমাদের চিবিয়ে খাবে।’
_ “আমি তো ভাবছি অন্য কিছু।’’ গম্ভীর গলায় বলল ফারহান।
_ “কী ভাবছ?’’ প্রশ্ন করল ইওন।
ফারহান ঘাড় ঘুরিয়ে ইওনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটা কুত্তা না কুত্তী?’ ইওন বেকুবের মতো ফারহানের দিকে চেয়ে রইল। ফারহান আবার বলে উঠল, ‘যদি কুকুর না হয়ে মুরগি হতো তাহলে ফ্রাই করে খাওয়া যেত।’
_ “আরে তুমি কী আবল-তাবল বকছ? আমাদের জীবন বিপর্যয়ে আর তুমি মজা করছ।’’ বলল ইওন।
_ “তুমিও অমর আমিও অমর। কুকুরটা তো মনে হয় না অমর। তোমার তলোয়ারটা দেও।’’
ইওনের হাত থেকে ফারহান তার তলোয়ার নিলো। তখুনি বিশাল কুকুরের মতো প্রাণীটা ফারহানের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ফারহান বিদ্যুৎ বেগে তলোয়ার দিয়ে কুকুরের গলা কেটে মাথা আলাদা করে দিলো।
_ “সমাপ্ত!’’ কুকুরের কাটা মাথার পাশে দাঁড়িয়ে কথাটা বলল ফারহান। ইওন হাতের ইশারায় ফারহানকে পিছনে তাকাতে বলল। ফারহান পিছনে তাকাতেই একটা জোড়াল লাথি তার মুখে এসে পড়ল। সে ছিটকে ইওনের পাশে এসে পড়ল। ইওন বলল, ‘মাথা বিহীন কুকুরের দেহটা তোমাকে লাথি মেরেছে। এটা সাধারণ কুকুর নয়।
ফারহান ওঠে দাঁড়াল। ইওনের তলোয়ার তার হাতে দিয়ে সে বলল, ‘চলো একসাথে কুকুরটাকে শেষ করা যাক।’’
ফারহান নিজের অন্ধকার রূপ নিলো। মহাজাগতিক রূপে সে নিজের সম্পূর্ণ শক্তি বলে কুকুরটির সাথে যুদ্ধ করতে লাগল ,সেই সাথে ইওন।
.
.
কুকুরটির সারা দেহ হাজারো টুকরো করল ফারহান আর ইওন মিলে। ফারহানের চোখ গেল মাঠ বরাবর সামনে থাকা টিলার উপরে ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটার দিকে। ব্যক্তিটা ত্রিশূল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। এই সেই লোক যাকে তারা আই অপ সাহারার জলের নিচে দেখেছিল। লোকটা তার হাতে থাকা ত্রিশূল ফারহানের দিকে ছুড়ে মারল। সে সরে গেল, ত্রিশূল তার বাঁ পাশের মাটিতে ভূমিষ্ঠ হলো। তৎক্ষণাৎ একটা তীব্র ভূমিকম্প শুরু হলো। ত্রিশূল উড়ে লোকটার কাছে ফিরে গেল।
ফারহান আর ইওনের পায়ের নিচের মাটি খসে নিচের দিকে যেতে লাগল। মাটির সঙ্গে সঙ্গে ফারহান আর ইওন তলিয়ে যেতে লাগল।
ইওন চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, ‘মাটির তলে চাপা পড়লে আজীবন অন্ধকারের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতে হবে।’ প্রত্যুত্তরে ফারহান কিছু বলল না। সেটা ইওনকে নিয়ে উড়াল দিলো।
_ “তুমি উড়তেও পারো?’’ প্রশ্ন করল ইওন।
_ “আমি উড়তে পারি, আলোর চেয়ে বেশি বেগে চলতে পারি। আমার ক্ষমতার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।’’
ইওন অবাক হলো। ত্রিশূলের মালিকের সামনে এসে দাঁড়াল ফারহান। ত্রিশূলের মালিক বলে উঠলেন, ‘তোমার এত ক্ষমতা কী করে? তুমি কী অল্যাম্পিয়াস? আমার চাচাদের মধ্যে কেউ? কিসের দেবতা তুমি? কালো শক্তির?’
_ “আমি সাধারণ একজন মানুষ।’’ বলল ফারহান।
_ “আশ্চর্য আমরা একে অপরের ভাষা কী করে বুঝতে পারছি?’’ ত্রিশূলের মালিককে প্রশ্ন করল ইওন।
_ “আমি এই মাত্র তোমাদের সেই ক্ষমতা দিয়েছি। আমি একজন দেবতা। আমার দ্বারা সব সম্ভব।’’ ত্রিশূলের মালিক কথাটা বলল।
_ “কে তুমি? জলের দেবতা পসাইডন?’’ প্রশ্ন করল ফারহান।
_ “না, পসাইডন আমার পিতা। আমি তাঁর বড় পুত্র আটলাস। এই আটলান্টিস শহরের বাদশা আমি। সেই সাথে এই শহরের দেবতা আমি। আমি আমার পিতার মতো জল নিয়ন্ত্রণ করতে পারি এই ত্রিশূল দিয়ে, সেই সাথে ঝড়, ভূমিকম্প তুলতে পারি। আমি একজন দেবতা।’’
ফারহান হাসল। হেসে সে বলল, ‘দেবতা! আমার মাথা। তুমি দেবতা হলে আমি দেবতাদের দেবতা।’
রেগে গেল আটলাস। সে ফারহানের বুকে জোড়াল একটা ঘুষি মারল। তার ঘুষির সাথে বিশাল এক জলের ধারা ক্ষিপ্র গতিতে তার বুকে আঘাত করল। কিন্তু ফারহান ছিটকে গিয়ে দূর পড়ল না, বরং নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে রইল। সে আটলাসের গলা চেপে ধরল। আটলাসের প্রহরীরা ফারহান এবং ইওনকে চারিদিক দিয়ে ঘিরে ধরল। তাদের হাতে ত্রিশূল। আটলাস হাতের ইশারায় প্রহরীদের থামতে বলল। ফারহান নিজের গায়ের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আটলাসের গলা চেপে ধরে রাখার পরও আটলাসের কিছু হলো না। ফারহান আটলাসের কথা ছেড়ে দিলো। আটলাস বলল, ‘আমাকে মারা এতটা সহজ নয়। তুমি হয়তো কোন কিছুর দেবতা, প্রকাশ করছ না। দেবতাদের যুদ্ধ বছর বছর ধরে চলে এরপর কেউ একজন পরাজিত হয়। তুমি একজন দেবতা, আমার রাজ্যে তোমাকে এভাবে বন্দি করায় তুমি রেগেছ। সেজন্যে আমি দুঃখিত।’
আটলাসের ইশারায় প্রহরীরা ত্রিশূল দ্বারা জল এনে ফারহান এবং ইওনের শরীরে থাকা ধুলোবালি পরিষ্কার করল। কোমল পোষাক এনে ফারহান এবং ইওনকে পরানো হলো। তারা সদয়ভাবে আটলাসের অতিথি আপ্যায়ন গ্রহণ করল।
কিছু প্রহরী একটা সুসজ্জিত পরিপাটি রুমে তাদের নিয়ে আসলো।
.
.
_ “আটলাসের হাবভাব দেখে তো মনে হচ্ছিল সে আমাদের এখানে আনেনি। তাহলে আমাদের এখানে কে এনেছে?’’ ইওনকে প্রশ্ন করল ফারহান।
_ “জটিল প্রশ্ন। তবে যাই হোক, এই রকম নরম বিছানা আগে কখনো দেখিনি।’’ বিছানার উপর শুয়ে কথাটা বলল ইওন। সে আবারও বলে উঠল, ‘মন তো চায় আজীবন এখানেই থাকি।’
মিনিট দশেক পর ইওন ঘুমিয়ে পড়ল।
আধা ঘণ্টা পর কিছু প্রহরী এসে ফারহান এবং ইওনকে খেতে যেতে আহ্বান করল। ইওন ঘুম থেকে উঠল। ফ্রেশ হয়ে এসে ফারহানের পাশে বসল সে।
_ “চলো, ফেডার উইল ভোজন করতে। খাবার টেবিলের খাবার আর রমণী দেখে চমকে যেও না।’’ বলল ফারহান।
_ “রমণী?’’ ভ্রু কুচকে বলল ইওন।
ফারহান প্রত্যুত্তরে কিছু না বলে প্রহরীদের সাথে যেতে লাগল। ফারহানের পিছন পিছন ইওন যেতে লাগল। একটা বিশাল হলে প্রহরীরা তাদের নিয়ে আসলো।
ইওন এবং ফারহান বিশাল এক কাঠের তৈরি টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। তারা বসল। তাদের বরাবার সামনে বসে আছে আটলাস। তবে টেবিলের দৈর্ঘ্যে চার মিটারের মতো। সুতরাং তাদের সামনে বসে থাকা আটলাসও চার মিটার দূরে।
একে একে টেবিলে খাবার আনা হলো। খাবারগুলো আনছে সুন্দরী রমণীরা। ইওন মৃদু গলায় ফারহানকে বলল, ‘কাপড়ের সংকট নাকি? মেয়েগুলার শরীরের প্রায় সব স্থানই তো দেখা যাচ্ছে। শুধু লজ্জাজনক স্থানগুলো ছাড়া।’
_ “এদিক সেদিক চোখ না দিয়ে খাবারে চোখ দেও। এসব রাজকীয়তা তোমার মগজে ঢুকবে না। ’’ বলল ফারহান।
খাবার শেষে আটলাস বলে উঠল, ‘তা কী উদ্দেশ্যে তোমার এখানে এসেছ?’
ফারহান আর ইওন একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। এবার কী উত্তর দিবে তারা? কিছুক্ষণ ভেবে ফারহান বলে উঠল, ‘আমরা অন্য গ্রহের রাজা। পৃথিবী ঘুরতে এসেছি।’
_ “ওহ, আচ্ছা। তাই তো বলি পৃথিবীর দেবতাদের কেন তোমরা চেন না। না চেনাই স্বাভাবিক।’’ বলল আটলাস।
ইওন আর ফারহান ম্লান হাসি হাসল। আটলাস আবারও বলে উঠল, ‘তোমাদের নাম কী?’
_ “আমি ফারহান আর সে ইওন।’’ বলল ফারহান।
_ “ফারহান, তোমার ক্ষমতা দেখে মনে হচ্ছে তুমি শক্তির দেবতা। তোমার শক্তির কোনো সীমা নেই। আর ইওনকে দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধের দেবতা। ঠিক…’’
আটলাস আরো কিছু বলতে চাইল, কিন্তু আর বলা হলো না। রাজ প্রসাদে বিশেষ কেউ এসেছে। আটলাস দৌড়ে গেল, যেতে যেতে সে বলল, ‘আমার পিতা পসাইডন এসেছেন। তিনি এতদিন তাঁর ভাই জিউসের প্রসাদে বাকি ভাইদের সাথে ছিলেন । অনেকদিন পর তিনি আজ ফিরেছেন।’ কথাটা বলেই আটলাস চলে গেল।
ইওন বলে উঠল, ‘পসাইডন আমাদের দেখে নিশ্চয়ই সন্দেহ করবে। আর যদি শুনে তার পুত্রের গলা টিপে ধরেছ তাহলে নির্ঘাত আমাদের হত্যা করবে। আমাদের সাবধান থাকতে হবে।’’
ফারহান মাথা নাড়ল।
.
.
আটলান্টিক মহাসাগরের জলরাশির উপর একটা জাহাজ তীব্র বেগে ছুটে চলেছে। সমুদ্রের জল সরিয়ে সরিয়ে এগিয়ে চলেছে শিপ.এ.কে.সেভেন। শিপের কিনারে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে চার্লস এবং শামীম। চার্লসের কোমড়ে একটা রিভলবার। সেটা শামীম তাকে সুরক্ষার জন্যে দিয়েছে। যখন তারা নিশ্চিত হলো এসব একটা প্রাণীর কাজ তখন তারা আর হাত গুটিয়ে বসে রইল না। জীবন গেলে যাবে কিন্তু প্রাণীটাকে দেখেই তারা মরবে। এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে কলিজা বড় করে বুক ভরা সাহস নিয়ে শিপ এ.কে.সেভেনে চড়েছে তারা।
আচমকা চার্লস লক্ষ্য করল সমুদ্রের জল কেমন কালো হয়ে যাচ্ছে। যেন জলরাশির নিচে বিশাল কালো একটা প্রাণী বসে আছে। চার্লস শামীমের দিকে তাকালো। শামীম এক দৃষ্টিতে জলের দিকে চেয়ে আছে।
চলবে…

0 Comments