#Lost_City_Of_Atlantis
লেখক:#শাহরিয়ার_হাছান
পর্ব-৯
_ “ট্রাইডেন্ট!’’ গম্ভীর গলায় বলল চার্লস।
বইয়ের মাঝে তিন মাথাওয়ালা চোখা এক অস্ত্রের চিত্র দেখে চার্লসের চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। অস্ত্রের চিত্রের নিচে বড় বড় ইংলিশ অক্ষরে লিখা ‘Trident'। ট্রাইডেন্ট অর্থ ত্রিশূল। অর্থাৎ তিনটে শিং এর মতো অস্ত্র। গ্রীক গড পোসাইডনের প্রথম পুত্র আটলাসের অস্ত্র এটি। এই অস্ত্র দিয়েই নাকি সে পুরো আটলান্টিক শহর ডুবিয়ে দেয়। শামীমের আনা বইগুলো থেকে সে আটলান্টিসদের ইতিহাস সম্পর্কে জেনেছে।
_ “বলা হয় আজও আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে ট্রাইডেন্ট হাতে বসে আছেন আটলাস। এই ট্রাইডেন্ট রক্ষার কাজ করে চলেছে এক মহাজাগতিক প্রাণী। এই প্রাণীটিই ছিল আটলাসের বাহক। চতুষ্পদী প্রাণীটি সম্পূর্ণ চেহারা এক মাত্র আটলাস ছাড়া আর কেউই দেখেনি। বলা হয়ে থাকে এই প্রাণীটি পুরো আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে ছড়িয়ে আছে। এটি এতই বড় যে এর হাত পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত অবধি যেতে পারে। এই সবই বইতে বলা হয়েছে। কী সত্য, কী মিথ্যে তা আমরা জানি না। তবে প্রাণীটি যে বিশাল তা নিয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই।’’ বলল শামীম।
_ “এই ট্রাইডেন্ট কোথায় আছে?’’ প্রশ্ন করল চার্লস।
_ “ট্রাইডেন্ট দিয়ে কী করবে? আমাদের তো প্রাণীটা খুঁজে বের করে হত্যা করতে হবে।’’
_ “উঁহু। তুমি বুঝতে পারোনি আমার কথাটা। বইতে বলা হয়েছে আটলাসের ট্রাইডেন্টের রক্ষার দায়িত্ব প্রাণীটার উপর। ট্রাইডেন্ট যেখানে প্রাণীটাও সেখানে।’’
_ “ট্রাইডেন্ট খুঁজে না পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ ট্রাইডেন্ট আদৌও আছে কিনা সেটা আমরা জানি না। কিন্তু প্রাণীটা আছে সেটা আমরা জানি। সেটার প্রমাণ আমরা পেয়েছি।’’ বলল শামীম।
_ “তাহলে বলো আমরা প্রাণীটা কিভাবে খুঁজব?’’ প্রশ্ন করল চার্লস।
_ “শিপ.এ.কে.সেভেন’’ হেসে বলল শামীম।
_ “তাহলে পুলিশও এখন সমুদ্র ভ্রমণে যেতে চলেছে।’’ হেসে বলল চার্লস।
.
.
সমুদ্রের তলদেশে হাটছে ফারহান এবং ইওন। ইওন ফারহানকে প্রশ্ন করল, ‘আই অফ সাহারায় এমন আশ্চর্যকর ক্ষমতা যে আছে সেটা কী বহিবিশ্বের মানুষেরা জানে?’
_ “না!’’
_ “এই সাধারণ একটা জায়গায় এমন অধ্যাতিক শক্তি, বিষয়টা কেন জানি আমার হজম হচ্ছে না। জায়গাটায় কিছু একটা তো আছে। ছয় রিং এর তৈরি এই জায়গাটা।’’
ইওন কথাটা শুনে ফারহান থমকে দাঁড়াল। সে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘কিহ! ছয় রিং?’
_ “হ্যাঁ তো?’’
ফারহান কিছুক্ষণ আই অফ সাহারা নিয়ে গবেষণা করতে লাগল। সে গম্ভীর গলায় বলে উঠল, ‘ছয়টা রিং, মাটিগুলো কেমন কেমন। যেন এই মাটির উপর বড় বড় স্তম্ব ছিল তাই না? আর মাঝের অংশটা অর্থাৎ চোখের মণির মতো অংশটা ঠিক তোমার বলা আটলান্টাস শহরের মতো নয় কী? মন্দিরের মাঝটা পড়ে চোখের মণির মাঝটা। আর সেখানেই নিজের রক্ত বিসর্জন দিলে অতীত দেখা যায়। এই জায়গাটায় আগে মন্দির ছিল না তো?’’
ইওন একটু ভাবল ।কিছুক্ষণ ভেবে সে চোখ বড় করে বলে উঠল, ‘এই সেই বাক্যটা মনে আছে?’
_ “কোনটা?’’ ভ্রু কুচকে বলল ফারহান।
_ “আলো, অন্ধকার, বালু, মরুভূমি, ধূলিস্বাদ, চোখে, আড়ালে-অন্তরে, জগত, মহাজগৎ নিয়ে যাবে তোমার গন্তব্যে। শেষ দুটো শব্দের অর্থ বুঝেছ? আই অফ সাহারা আমাদের জগত থেকে অন্য জগতে তাকিয়ে আছে। শেষে বলা হয়েছে নিয়ে যাবে তোমার গন্তব্যে। তোমার আমার গন্তব্য হলো আটলান্টিসদের হারিয়ে যাওয়ার শহর এবং সেই প্রাণীটি। এর অর্থ আই অফ সাহারাই হলো…’’
ইওনের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ফারহান বলল, ‘আই অফ সাহারাই হলো দ্যা লস্ট সিটি অফ আটলান্টিস।’’
_ “মিথে বলা হয়েছে আটলান্টিসদের হারিয়ে যাওয়া শহর সমুদ্রের নিচে চলে যায়। আর প্লেটো বলেন সেটা আটলান্টিক মহাসাগরে রয়েছে। এক তত্ত্বকথা বলছে আটলান্টিক মহাসাগরে আরেক তথ্যতত্ত্ব কথা বলছে আই অফ সাহারাতে। জটিল প্যাঁচ।’’
_ “আমাদের নিকটে কোনটা?’’ টানা হাসি হেসে বলল ফারহান।
ঘাড় বাকিয়ে ইওন বলল, ‘আই অফ সাহারা।’
_ “তো চল সমুদ্র থেমে বেরিয়ে মরুভূমিতে আবারও পা রাখি। আগে আই অফ সাহার দেখে আসি। তারপর না হয় আটলান্টিক মহাসাগর। আমাদের তো তেমন একটা তাড়া নেই তাই না?’’
_ “উচিত কথা বলেছ।’’
ইওন এবং ফারহান সমুদ্র থেকে বেরিয়ে মরুভূমিতে পা রাখল। ধীর পায়ে তারা এগিয়ে যেতে লাগল আই অফ সাহারাতে।
.
.
আই অফ সাহারাতে এসে তারা দু'জন তেমন কিছুই দেখতে পেল না। পুরো জায়গাটা খোঁজাখুঁজি শেষে ফারহান বলে উঠল, ‘এখানে মাটি ছাড়া আর কোনো কিছুই নেই। কোনো ধাতু কিংবা অন্যরকম কোন পাথরের টুকরোও নেই।’
_ “সব তো দেখলাম আমরা শুধু এই ছয় রিং এর মাঝে থাকা পানির নিচে গিয়ে আমরা দেখিনি। চলো দেখে আসি।? ’’ বলল ইওন।
চোখের মণির মতো অংশের চারিদিকে থাকা পানিতে ডুব দিল তারা। ধীরে ধীরে তারা পানির গভীরে যেতে লাগল। তলদেশে পা রেখে দু'জনে সামনে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াল। অস্পষ্ট স্বরে ফারহান বলে উঠল, ‘হায় খোদা! একি দেখছি..!’
.
.
চোখের সামনে থাকা দৃশ্যটা কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছে না তারা। তাদের সামনে বসে আছে একটা মানব দেহ। আকারে তাদের তুলনায় কয়েকগুণ বড়। একটা চোখা ত্রিশূল মাথা বরাবর রেখে বসে আছে দেহ দেহটা।
ফারহান এবং ইওন সেদিকে এগিয়ে যেতেই অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে গেল। তাদের সামনে থাকা পুরো দৃশ্য পাল্টে গেল। তারা ফিরে এলো উত্তপ্ত মরুভূমি। কিভাবে তারা ফিরে এলো তা তারা বুঝতে পারল না।
ইওন ফারহানকে প্রশ্ন করল, ‘আমরা এখানে কী করে এলাম?’
ফারহান প্রত্যুত্তর না দিয়ে হাতের ইশারায় ইওনকে সামনের দিকে তাকাতে বলল। ইওন সামনে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াল। তার গলাটা এত শত বছর পর প্রথমবার শুকিয়েছে। সামনে থাকা আই অফ সাহারার বুকে এখন বিশাল বিশাল ইমারত। অদ্ভুত সব পাথর দিয়ে তৈরি এক শহর। শহরের মাঝে বিশাল একটা মন্দির। মন্দিরের উপরিভাগ আকাশ ভেদ করে ফেলেছে।
ফারহান কাঁপা গলায় বলল, ‘আমরা মনে হয় অতীতে ফিরে এসেছি। আটলান্টিক শহর চায় আমরা যেন তাকে দেখি। হয়তো সেই মানব দেহটি আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে।’
_ “চলো শহরটা দেখে আসি।’’
.
.
শহরের প্রবেশ দ্বার স্বর্ণের তৈরি। স্বর্ণের তৈরি বিশাল এক দরজা। খোলা দরজা দিয়ে প্রবেশ করল ফারহান এবং ইওন। ভেতরের শহরটা দেখে তাদের চোখ জুড়িয়ে গেল। এ যেন তারা স্বর্গে চলে এসেছে। শহরটা এত সুন্দর ভাবে সাজানো হয়েছে যে প্রথম দেখায় যে কেউ মুগ্ধ হবে। শহরের মানুষগুলো পরীর চেয়ে কম নয়। সুন্দর, ফর্সা, লম্বা। লোহা, তামা, কপার, নিকেল দিয়ে নানান রকম ভিন্ন ধর্মী আসবাবপত্রে ভরে আছে শহরের এক প্রান্তে থাকা বাজারটা। কিছু লোক অদ্ভুত এক ভাষায় তাদের ডাক দিলো। ফারহান বুঝতে পারল তাদের দোকান থেকে পণ্য কেনার জন্যে ডাকছে তারা। ফারহান আলতো হাসল।
শহরের ভেতরটায় আসতে একটা বিশাল প্রসাদ তাদের চোখে পরল। প্রসাদের এক বারান্দায় দাঁড়িয়ে ত্রিশূল হাতে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক। লোকটাকে ফারহান আর ইওন বেশ ভালো করে চিনতে পেরেছে। এই সেই লোক যাকে তারা পানির নিচে ত্রিশূল হাতে দেখেছি। তার কাছে গেলে নিশ্চয়ই তারা তাদের এখানে আনার কারণটা জানতে পারবে। এগিয়ে গেল তারা প্রসাদের দিকে। পথিমধ্যে ইওন বলে উঠল, ‘আচ্ছা! এত সুন্দর, সভ্য, আধুনিক শহরে কোনো প্রহরী নেই? আমরা যে বিদেশী এতক্ষণে তো সকলে জেনে যাওয়ার কথা। কিন্তু কোনো পদক্ষেপই তারা নিচ্ছে না। অদ্ভুত নয় কি?’
ফারহান কিছু একটা বলতে নিলো। কিন্তু সেই সুযোগ আর হয়ে উঠল না। আচমকা তাদের সামনে থাকা আলোকিত জগতটা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল। যেন কেউ কাদের বদ্ধ খাঁচায় বন্দি করে ফেলেছ।
.
.
চলবে…

0 Comments