#Lost_City_Of_Atlantis
লেখক:#শাহরিয়ার_হাছান
পর্ব-৮
সমুদ্রের তীরে এসে দাঁড়াল ফারহান এবং ইওন। সমুদ্রের জলের দিকে তাকিয়ে ইওন বলল, ‘পেছনে মরুর উত্তপ্ত বাতাস, সামনে সমুদ্রের শীতল বাতাস। এই নতুন আবেশে বলছি সেই কাহিনিটা। কাহিনি বললে ভুল হবে, বলা চলে বাস্তব। আশা করি গ্রীক দার্শনিক প্লেটোর নাম শুনেছ। সময়টা খ্রীষ্টপূর্ব ৩৬০ শতকের ঘটনা অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় দু'হাজার তিনশ আশি বছর পূর্বের ঘটনা।
ফিরে
রিচার্ড দৌঁড়ে ছুটে গেল প্লেটোর কাছে। দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দে এক প্রকার বিরক্ত হয়ে ঘুম থেকে ওঠে এলেন গ্রীক দার্শনিক প্লেটো। দরজা খুলে বিরক্তি ভরা গলায় তিনি বলে উঠলেন, ‘এত সাতসকালে কে এসেছে?’
দৌড়ে আসায় রিচার্ড হাঁপিয়ে গেছে। ঝুঁকে সে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। রিচার্ডকে দেখে প্লেটো মনে মনে ভাবলেন, ‘ছেলেটা কখনো বিনা কারণে আমার দরজায় কড়া নাড়েনি। আজ এত সাতসকালে আমার দরজায় কড়া নাড়ার পেছনে নিশ্চয়ই কোন বড়-সড় কারণ করেছে। রিচার্ড একজন ব্যবসায়ী, ছেলেটা বেশ সৌখিন। দামী জামা-কাপড় সুন্দর বাড়ি আর চাহিদা মাফিক কত কী!’
রিচার্ড মুখ তুলে প্লেটোর দিকে তাকাল। বেশ জোর গলায় সে বলে উঠল, ‘স্যার, আপনি এসব কী লিখেছেন? প্লেটো, নামটি শুনলে মানুষ যুক্তিসংগত নতুন কিছু জানতে পারবে বলে আশা করে। আর আপনিই কিনা রূপকথার গল্প লেখা শুরু করেছেন? নিজ হাতে নিজের সম্মান আপনি ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন।’
প্লেটো ভ্রু কুচকালেন। তিনি রিচার্ডের গালে হাত দিয়ে ওর মুখ দেখতে লাগলেন।
_ “না, দেখে তো মনে হচ্ছে না তুমি নেশা করেছ। তাহলে এমন নেশাগ্রস্তদের মতো করে কথা কেন বলছ?’’
রিচার্ড তার হাতে থাকা দুটো বই প্লেটোর দিকে এগিয়ে দিলো। প্লেটো বই দুটো দেখে বুঝতে পারলেন বিষয়টা কী। দরজার সামনে থেকে সরে গেলেন প্লেটো। তিনি রিচার্ডকে ভেতর আসতে বললেন। রিচার্ড ভেতরে এসে বসল। রিচার্ডের সামনে মুখোমুখি হয়ে বসলেন গ্রীক দার্শনিক প্লেটো। রিচার্ড তার হাতে থাকা বই দুটো প্লেটোর দিকে এগিয়ে দিলেন।
প্লেটো বলে উঠলেন, ‘টাইমিয়াস এণ্ড ক্রিটিয়াস। বই দুটো আমি লিখেছি, আমার স্বরচিত।’
_ “বইতে আপনি এসব আজগুবি কথা কেন লিখেছেন?’’
_ “আটলান্টিসদের নিয়ে বইতে লিখেছি বলে আজগুবি মনে হচ্ছে?’’
_ “জ্বী, রূপকথার গল্প হয়ে গেল না?’’ প্রশ্ন করল রিচার্ড।
প্লেটো এক গাল হাসলেন। হেসে তিনি বললেন, ‘আমাকে আজগুবি কথা বলতে কখনো দেখছ?’ আমি যা বলি ভেবেচিন্তে প্রমাণের সহিত বলি। আটলান্টিসদের নিয়ে আমার প্রমাণ নেই? কে বলেছে নেই? বিশ্বাস না হলে সমুদ্র ছাঁকো।’
_ “কিন্তু লোকেরা তো বিশ্বাস করবে না।’’
_ “ইতিমধ্যে অনেকে বিশ্বাস করেও ফেলেছে। এমনকি তুমিও বিশ্বাস করে ফেলেছ। বিশ্বাস না করলে এখানে আসতে না। বিশ্বাস হয়েছে বলেই আরো জানতে আমার কাছে ছুটে এসেছ।’’
রিচার্ড কিছু বলল না। একটু পর সে বলে উঠল, ‘ঠিক বলেছেন। আমি আটলান্টিসদের নিয়ে জানতে চাই।’
প্লেটো এক গ্লাস পানি পান করলেন। জিব ভিজিয়ে তিনি বললেন, ‘আজ থেকে প্রায় এগারো হাজার পাঁচশ সাল পূর্বে আটলান্টিসরা ছিল। এই শহরে ধন-সম্পদের কোনো অভাব ছিল না। ওরা ছিল আধুনিক, ওদের শহরে গরিব ছিল না কেউ।
_ “এই শহর কোথায় অবস্থিত?’’
_ “বর্তমানে আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে এই শহর চিরনিদ্রায় শুয়ে আছে।’’
_ “এই শহর কিভাবে ধ্বংস হলো?’’
_ “আগে জন্মটা বলি, তারপর মৃত্যু। Greek god Poseidon একদা পৃথিবীর সবচেয়ে মেধাবী জনগোষ্ঠীর খোঁজে বের হন। এরপর তিনি আটলান্টিস নামের শহর খুঁজে পান, যেখানকার লোকেরা অনেক বুদ্ধিমান ছিল। এই শহরের এক সুন্দরী নারী ক্লেটার প্রেমে পড়ে যান। এরপর পোসাইডেন আর ক্লেটার বিয়ে হয়। তাদের পাঁচ যমজ ছেলে সন্তান হয়। তাদের বড় সন্তানের নাম ছিল আটলাস। যে পরবর্তী আটলান্টিসের রাজা হয়। পিতার সম্মানার্থে আটলাস একটা মন্দির নির্মাণ করে। সেই মন্দির এত উঁচু ছিল যে বলা হয় মন্দিরের উপরিভাগ মেঘ ভেদ করে যেত। মন্দির মধ্যে ছিল পোসাইডনের স্বর্ণের মূর্তি। রথের উপর বসা পোসাইডনের মূর্তি। তাদের শহরে কেউ গরিব ছিল না। তারা এমন সৌখিন জীবন যাপন করতেন যেন তারা স্বর্গে বাস করছেন। ধারণা করা হয় পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্ব আটলান্টিসরা লেরিন স্টার সিস্টেম থেকে এসেছে। যারা আমাদের তুলনায় অনেক লম্বা, সুন্দর এবং বুদ্ধিমান ছিল। তারা প্রায় আটশ বছর বেঁচে থাকত। তাদের শহরের লোকেদের ধন-সম্পদ, আসবাবপত্র কপার ,জিংক, লেড, লোহা, নিকেলের ছিল। আটলান্টিস শহরের ধ্বংস কারণ হলো এই সভ্যতার শেষের দিকে আটলান্টিস শহরের বাসিন্দারা লোভী হয়ে পড়ে। চারিদিকে যুদ্ধ, বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। এসব দেখে পোসাইডেন ক্ষিপ্ত হয় এবং সে তার ক্ষমতার বলে পুরো আটলান্টিস শহর পানির নিচে ডুবিয়ে দেয়।’’
.
.
_ “ফারহান, কোথায় হারালে?’’ প্রশ্ন করল ইওন।
ফারহান চোখ ঢলে ইওনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাকিটুকু আমি জানি। শুনেছি এই আটলান্টিসদের ঘটনা। এবার মনে পরল আমার। আমেরিকার বিজ্ঞানীরা বলেছেন পৃথিবীর ম্যাগনেটিক পুলের অবস্থানের পরিবর্তনের ফলে আটলান্টিস শহর পানির নিচে তলিয়ে যায়। পৃথিবীর ম্যাগনেটিক পুলের অবস্থান তখনই পরিবর্তন হয় যখন পৃথিবীর সামনে দিয়ে এমনটা গ্রহ কিংবা উল্কা পিণ্ড অতিক্রম করবে যার ম্যাগনেটিক পুল পৃথিবীর তুলনায় অনেক বেশি। এর প্রমাণও মিলেছে, হাজার বছর পৃথিবীর চেয়ে অধিক ম্যাগনেটিক পুল সম্পন্ন উল্কা পিণ্ড পৃথিবীর সামনে দিয়ে যায়। যার ফলে পৃথিবীর ম্যাগনেটিক পুলের অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। দেবতার শহর ডুবায়নি, প্রকৃতি ডুবিয়েছে।’’
_ “কে জানে প্রকৃত পক্ষে আটলান্টিসদের সাথে কী হয়েছিল।’’ হেসে বলল ইওন।
ফারহান বলল, ‘এত বছর পূর্বে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া শহরের অস্তিত্ব না মিলাই স্বাভাবিক।’
_ “ঠিক বলেছ। ’’
এই বলে ইওন তীরে থাকা একটা পাথরের টুকরো সমুদ্রে ছুড়ে মারল। সে বলল, ‘দশ মিটারের মধ্যেই রয়েছে পাথরটা। তুমি তো দেখছ পাথরটা কোথায় গিয়ে ডুবেছে। এই আট থেকে দশ মিটারের মধ্যে। কিন্তু খুঁজে বের করতে পারবে?’
_ “অনেক দিন লাগবে।’’
_ “যতদিন গড়াবে তত না খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। কারণ পাথরের উপর বালির আস্তরণ পড়তে পারে, শেওলা জমতে পারে কিংবা অন্য কিছু। সুতরাং হাজার বছর পূর্বে ডুবে যাওয়া সেই শহরের সন্ধান না পাওয়াই স্বাভাবিক।’’
_ “মন্দিরের মধ্যে পোসাইডেনের যে মূর্তি স্থাপন করা হয়, সে মূর্তিতে পোসাইডেন রথের উপর বসে ছিল। হতে পারে সমুদ্রের নিচে থাকা যেই প্রাণীটার সন্ধান আমরা করছি সেটাই পোসাইডেনের রথ।’’
_ “রথ এত বিচ্ছিরি হতে পারে তা আমার জানা ছিল না।’’ হেসে বলল ইওন।
ফারহান কিছু বলল না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। ইন্দ্রিয় তৃপ্তির জন্যে এখনো তারা আহার গ্রহণ করেনি। ফারহান ইওনের পেটে চাপড় মেরে বলল, ‘খুদা লাগে না তোমার?’
_ “না। ’’ গম্ভীর গলায় বলল ইওন।
ফারহান মাথা উপর থেকে নিচে ঢুলাল। ইওন আবারও বলে উঠল, ‘আমাদের মধ্যে বেশ ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।’ কথাটা বলে ইওন ভ্রু কুচকাল। সে বলে উঠল, ‘আমি তো মিশরীয় ভাষায় কথা বলছি। তুমি আমার ভাষা বুঝতে পারছ কী করে?’
ইওন বেকুবের মতো এমন একটা প্রশ্ন করে বসবে তা ফারহান কখনো ভাবতে পারেনি। সে বলে উঠল, ‘অদ্ভুত তো! মিশর নিয়ে আমার কত স্মৃতি রয়েছে। কত বছর মিশরে ছিলাম। মিশরের ভাষা আমি বুঝি এবং মিশরীয় ভাষায় আমি কথা বলতেও পারি।’
ইওন হঠাৎ করে বলে উঠল, ‘আমি তো অনেক কিছু হারিয়েছি। প্রিয়জন, দেশ সবকিছু। তুমি কিছু হারাও নাই?’
ফারহান কিছু বলল না। এক দৃষ্টিতে উত্তাল সমুদ্রের দিকে সে চেয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর সে হেসে বলে উঠল, ‘না, আমি কাউকেই হারাইনি।’
_ “মুখে হাসি, চোখে জল।’’ হেসে বলল ইওন।
ইওনের সাথে সাথে ফারহানও হেসে উঠল।
_ “তোমার চোখ থেকে কিছুই আড়াল করা সম্ভব নয়।’’
ইওন হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
_ “তো আটলান্টিক মহাসাগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা যাক।’’ ইওনকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলল ফারহান।
_ “আমি সাঁতার কাটতে জানি না।’’ বলল ইওন।
ফারহান হা করে ইওনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘ফেডার উইল, সমুদ্রে সাঁতার কাটে কে? জীবনে দেখেছ মাঝ সমুদ্র অবধি সাঁতার কেটে কাউকে যেতে?’
ইওন মাথা চুলকিয়ে বলল, ‘ওহ! তাই তো। সমুদ্রে কে সাঁতার কাটে! তা আমরা কিভাবে যাব?’
_ “আমরা পানির নিচ দিয়ে যাব। সমস্যা নেই, অক্সিজেন নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। সেটা আমি আমার ক্ষমতা বলে সরবরাহ করতে পারব। তোমাকে শুধু আমার ক্ষমতার সাহারা নিতে হবে। কিছু অন্ধকার শক্তি দিচ্ছি তুমি সেটা গ্রহণ করে নেও।’’
ফারহান এক মুঠো সমুদ্রের জল নিলো। তার দেহ থেকে কালো কিছু পদার্থ জলের সাথে মিশে গেল। জেলির মতো কালো থকথকে একটা পদার্থ তৈরি হলো। সে হাত বাড়িয়ে ইওনকে পদার্থটা খেতে বলল। ইওন নির্দ্বিধায় খেয়ে ফেলল। খাবার সঙ্গে সঙ্গে ইওন আঁতকে উঠল।
_ “আমার ফুসফুসে কিছু একটা হচ্ছে। কিছু একটা পরিবর্তন হচ্ছে সেটা। আহ….হ’’ চিৎকার দিয়ে বলল ইওন।
মিনিট দশেক পর ইওনের ব্যথা পুরোপুরি ভাবে চলে গেল। ফারহান ইওনকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘এবার পানির নিচে যতক্ষণ ইচ্ছে তুমি থাকতে পারবে। অক্সিজেন নিয়ে ভাবতে হবে না। তোমার দেহ অক্সিজেন পানির থেকে নিয়ে নেবে।’’
ইওন মাথা নাড়ল। কিছু বলল না সে।
.
.
পরের দিন সকাল সকাল পুলিশ অফিসার শামীম কয়েকটা বই নিয়ে চার্লসের ঘরে হাজির হলো। চার্লস অফিসারকে সাতসকালে দেখে কিছুটা বিবর্ত হলো।
_ “কী হলো অফিসার আপনি এত সকাল সকাল?’’
_ “এই বইগুলোতে চোখ বুলাও। সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।’’ গম্ভীর গলায় বললেন অফিসার।
চলবে…..
ভাবছি দেবতা পোসাইডেন এবং আটলান্টিসদের নিয়ে একটা ভিডিও করব, যেখানে বিস্তারিত সব বলা থাকবে। আপনার যদি জানতে ইচ্ছুক হন তবেই করব।

0 Comments