#Lost_City_Of_Atlantis
লেখক:#শাহরিয়ার_হাছান
পর্ব-৭

চারিদিকে অন্ধকার ছেয়ে গেছে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলো। আকাশ মহাকাশে রূপান্তরিত হলো। ফারহান রূপান্তরিত আকাশের দিকে চেয়ে আছে। ইওনের ফেরার অপেক্ষা করছে সে।
_ “ইওন নিশ্চয়ই অতীতে গিয়ে এতক্ষণে আমাকে হত্যাও করে ফেলেছে।’’ মনে মনে বলল ফারহান। ইওন চলে যাওয়ার পর ফারহানের কাটা মাথা আবার তার দেহের সাথে জুড়ে যায় কারণ সে তো অমর। এবং তার মধ্যে অন্ধকার জগতের অধ্যাতিক শক্তি রয়েছে।
একটা বিকট শব্দ তার পেছন থেকে এলো। চোখের ওপর থাকা পাথুরে পর্দা সরে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে চোখটা আবার কৃত্রিম চোখে রূপান্তরিত হলো। কৃত্রিম চোখের মণির মাঝে বসে আছে ইওন। তার ডান পাশে পড়ে আছে তার তলোয়ার। সে তার কালচে রক্ত মাখা হাতের দিকে চেয়ে থেকে কাঁদছে। ফারহান ধীরু পায়ে ইওনের পাশে গিয়ে বসল।
_ “পুরোনো স্মৃতিতে ভরসা করতে নেই। কারণ সময়ের সাথে স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যায়। আর এই ঝাপসা স্মৃতিকে বিশ্বাস করে কোন পদক্ষেপ নেওয়ার অর্থ বিপতগামী হওয়া। আমি জানি তুমি কী দেখেছ। বিশ্বাস করো ফেডার উইল তোমার সভ্যতার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে আমি হত্যা করিনি। সেটা আমার ভাই করেছিল। আমি ভাইকে পরাজিত করি। এরপর তুমি আসো এবং ভাবো সবটা আমি করেছি। আমাকে তুমি হত্যা করো। কিন্তু আমাকে হত্যা করায় আমার মধ্যে থাকা অন্ধকার শক্তি পুরো মিশরে ছড়িয়ে যায়। ফলে বেঁচে থাকা বাকিরাও মারা যায়। ’’
ইওন ফারহানের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি বেঁচে আছ কী করে?’
_ “আমি অমর। কাটা মাথা তুমি যাবার কিছুক্ষণ পরেই জুড়ে যায়।’’
_ “জানো অতীতে ফিরে দেখি আমার পুরো সভ্যতার অর্ধেক জনগোষ্ঠী মারা গেছে। আর তুমি তোমার মহাজাগতিক রূপে ছিলে। আমি তোমাকে হত্যা করি আর তোমার মধ্যে থাকা কালো শক্তি বাকি মানুষদের হত্যা করে ফেলে। পরোক্ষভাবে আমি নিজ হাতে নিজের সভ্যতা ধ্বংস করেছি।’’
_ “আমি তোমাকে পুরো ঘটনা খুলে বলছি। আমি অন্ধকার জগত থেকে এসেছি। আমার বাবা অন্য মাত্রার অন্য এক জগতের ছিলেন আর আমার মা এই মিশরের বাসিন্দা ছিলেন। আমার জন্মের পর আমাকে অন্ধকার এবং আলোর জগতে মাঝে রেখে আসা হয়। এর পেছনে অনেক কাহিনি রয়েছে, বলতে পারো আমার বাবার পরিবারের লোকেরা মানতে পারেননি। বাবা অন্ধকার জগতে ফিরে যান আর মা পৃথিবীতে রয়ে যান। আর আমি দুই জগতের মাঝে। এরপর আমি বড় হয়ে আলোর জগতে ফিরে আসি। আমার সাথে ছিল আমার পোষা প্রাণীটা। মিশরে থাকা শুরু করি, সব ভালো চলছিল। কিন্তু ভুলবশত আমি দুই জগত পৃথককারী দরজা খুলে ফেলি। ফলাফল আমার সৎ ভাই পৃথিবীতে আক্রমণ করে। তোমার সভ্যতার অর্ধেক লোককে মেরে ফেলে সেই সাথে আমার পোষা প্রাণীটাও। তারপর আমি আমার সৎ ভাইকে তার জগতে ফিরে যেতে বাধ্য করি। এরপর তুমি আসো, আমাকে দেখো ভাবো আমি সব করেছি। আর তুমি আমাকে হত্যা করো। আমি তখন পুরো রেগে ছিল যার ফলে তোমার আঘাতে আমার মধ্যে থাকা সব শক্তি বিচ্ছুরিত হয়। এতে তোমার সভ্যতার সবাই মারা যায়। তখন আমি নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে জানতাম না। তাই নিজের ক্ষত ঠিক করতে জানতাম না। আমার দেহ নষ্ট হওয়ার পর হাজার বছর রুহ হয়েই ঘুরে বেড়াই। তারপর নতুন দেহে প্রবেশ করি।’’
_ “বুঝেছি তোমার দোষ নেই। তবে এই চোখের মণিতে যদি তুমি তোমার কালো রক্ত আবার দেও তাহলে আমি অতীতে ফিরে গিয়ে নিজের ভুল শুধরাতে পারব।’’
ফারহান হাসল, হেসে সে বলল, ‘ভাগ্যকে পরাজিত করা যায় না। কাগজের লিখাটা মনে আছে? The reality will become a dream and the darkness will become the light. তুমি যদি অতীতে গিয়ে সব বদলাও তাহলে আজকের বাস্তব জগত তোমার স্বপ্নে পরিণত হবে। এত হাজার বছরের ইতিহাস পুরো বদলে যাবে। নতুন দুনিয়া কেমন হবে তাই আমরা জানি না। তাছাড়া আমার অন্ধকার শক্তি এই জগতের চারিদিকে ঘুরে বেড়াবে। অতীতে আমি নিজের শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না। সুতরাং যদি তুমি অতীতে গিয়ে সব বদলাও তাহলে ভয়াবহ কিছু ঘটতে পারে। আর তাছাড়া আমি নিজেই সময় ভ্রমণ করতে পারি। তাই তো আমার রক্ত তোমাকে অতীতে নিয়ে যেতে পেরেছে। শোনো, ফেডার উইল আমি বহুবার সময় ভ্রমণ করেছি। ললাটের লিখন পাল্টায় না। ভাগ্যে যাই আছে তাই ঘটবে। ভাগ্যের সাথে লড়ার অর্থ প্রকৃতির সাথে লড়া। প্রকৃতি আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, নাকি আমরা প্রকৃতিকে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গেলে আমরাই নিঃস্ব হবো। যা হয়েছে তা মেনে নেও।’’
_ “পারছি না মানতে। চোখের সামনে হাজার হাজার মানুষের আর্তনাদ।’’
_ “জানি কঠিন হবে, তবে মেনে নিতে হবে।’’
ঘণ্টাখানেক নীরব হয়ে এভাবেই দু'জনে বসে রইল। ইওন নিজেকে শান্ত করল, যা হয়েছে সে তা মেনে নিলো। ভাগ্য থেকে পালানো অসম্ভব তাই মেনে নেওয়াই ঠিক হবে। নীরবতা ভেঙে ফারহান বলল, ‘আলো, অন্ধকার, বালু, মরুভূমি, ধূলিস্বাদ, চোখে, আড়ালে-অন্তরে, জগত, মহাজগৎ নিয়ে যাবে তোমার গন্তব্যে। আলোর জগতে আমি অন্ধকারের সন্তান এলাম বালুময় নগরীতে। যে নগরী মরুভূমিতে অবস্থিত। এরপরের শব্দ ধূলিস্বাদ, আমি তথা আমাদের দ্বারা ধ্বংস হয়েছে একটা সভ্যতা। এই ইতিহাস সকলের আড়ালে ছিল, শুধু আমার আর তোমার অন্তরে ছিল। জগত, মহাজগতের দিকে চেয়ে থাকা এই চোখ আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলো। এক বাক্যো হাজার বছরের মুছে যাওয়া ইতিহাস। অদ্ভুত না?’
ইওন ফারহান দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল। ভেবে সে বলল, ‘এই একটা বাক্যের ব্যাখ্যা বুঝেছি। কিন্তু বাকি বাক্যের ব্যাখ্যা কী? আর ওই লোকটা আমাদের সম্পর্কে এতকিছু কী করে জানত? এত নিপুণতার সাথে শব্দের গাঁথুনি! যেন লোকটা আমাদের সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানত। অদ্ভুত!’
_ “জানি না লোকটা কে! তবে এই বাক্য এবং বাস্তব স্বপ্ন হবে, অন্ধকার আলো হবে এই দুটো বাক্যের ব্যাখ্যা বুঝেছি। কিন্তু বাকিগুলোর ব্যাখ্যা?’’
_ “সমুদ্রের নিচে থাকা সেই প্রাণীটার নিকট গেলেই বাকি রহস্য উন্মোচন হবে।’’
_ “তুমি জানো সমুদ্রের নিচে প্রাণীটা কোথায় রয়েছে?’’
_ “না!’’ গম্ভীর গলায় বলল ইওন
_ “কিন্তু চিরকুটের লিখা তো বলছে তোমার কাছে এলেই গন্তব্যে পৌঁছাব।’’
_ “পানি আমার দুর্বলতা। তবে আটলান্টিক মহাসমুদ্রের নিচে যা আছে তা নিয়ে কিছুটা ধারণা রয়েছে। আমার বয়স যখন পনেরো কী ষোল তখন আটলান্টিক মহাসাগর নিয়ে বিদঘুটে কথা শুনেছিলাম। জানি না কতটুকু সত্য।’’
_ “যতটুকু জানো আমাকে বলো।’’
ইওন ওঠে দাঁড়াল। সমুদ্রের তীরের দিকে সে হাঁটা ধরল। পেছন পেছন ফারহান তাকে অনুসরণ করতে লাগল। ইওন গম্ভীর গলায় বলল, ‘নীলচে জলরাশিকে সাক্ষী রেখে তার একটি রহস্য তোমাকে বলব। চমকে যাবে না আশা করি।’
_ “দেবতা কিংবা মহাজাগতিক অন্য জগতের কোনো প্রাণী নিয়ে নিশ্চয়ই?’’ প্রশ্ন করল ফারহান।
ইওন কিছু বলল না, এক গাল সে হাসল। মনে মনে সে জলের গুপ্ত সেই ইতিহাস গুছিয়ে নিতে লাগল। সামনে ফারহানকে বুঝিয়ে যে বলতে হবে যে!
কিছুদূর যাওয়ার পর ইওন বলে উঠল, ‘মিথ বনাম সত্য করলে দেখতে মিথের অনেক কিছুই সত্য। কারণ সত্যকে ঢাকতে মিথ্যা বলা হয়। আর সত্য ছাঁকনি দিয়ে যখন মিথ্যে ছাঁকবে তখন দেখবে মিথ্যের মধ্যেও অনেকগুলো সত্য ছিল। আর সত্য মিথ্যের সংমিশ্রণই হলো মিথ।’
_ “গ্রীক মিথ শুনাতে চলেছ নাকি?’’ প্রশ্ন করল ফারহান।
_ “না! চেনা জানা এক দার্শনিকের কথা বলব তোমাকে।’’
.
.
  দরজায় জোড়াল কড়া নাড়ার শব্দে দৌড়ে এসে দরজা খুলল চার্লস। দরজার ওপাশে অফিসারকে দেখে চার্লস কিছুটা বিচলিত হলো।
চার্লস অফিসারকে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছে?’
_ “তোমার কথাগুলো সত্য ছিল। বন্দরে গেছিলাম, শুনলাম শান্ত সমুদ্রে আচমকা অদ্ভুত কিছু একটা ঘটেছে। আচমকা কিছু একটার ধাক্কায় পুরো জাহাজ দুলতে শুরু করে এবং  শিপের অর্ধেক নাবিক সমুদ্রের জলে পড়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। নিশ্চয়ই তোমার বলা প্রাণীটার কাজ।’’
_ “যাক, শেষ অবধি আমার কথা বিশ্বাস তো হয়েছে।’’ বলল চার্লস।
অফিসার চার্লসের ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। চার্লস অফিসারকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা! আপনার নামটা কী? এখনো জানা হলো না।’
_ “শামীম।’’
চার্লস মাথা চুলকাল। মাথা চুলকানোর কারণ হলো সাদা-মাটা নাম কিন্তু কাজ করে পুলিশে? লোকে ঠিকই বলে, নাম দিয়ে কী? কাজেই সব।

চলবে….
ছোটো দিলাম কারণ সামনে আসল গল্প.....