#Lost_City_Of_Atlantis
লেখক:#শাহরিয়ার_হাছান
পর্ব-৬
ঘণ্টাখানেক হেঁটে চলার পর ইওন খেয়াল করল তার হাতে তলোয়ার নেই। সে থমকে দাঁড়াল। কোথায় তলোয়ার সে ফেলে রেখে এসেছে? ইওন মাথায় একটু জোর দিতেই তার মনে পরল সে সমুদ্রের পাড়ে রেখে চলে এসেছে। দ্রুত সে ফিরে সমুদ্রের দিকে যেতে লাগল। আনমনা হয়ে সে যে নিজের তলোয়ার ফেলে রেখে চলে আসবে তা সে কখনো ভাবতেও পারেনি। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ইওন মনে মনে ভাবল, ‘পৃথিবীর আকাশ বড়ই অদ্ভুত। অদ্ভুত বলার কারণ দিনের বেলায় নীল আকাশ হলেও রাতের বেলায় নীল আকাশ নয়। কারণ রাতের বেলায় আকাশ মহাবিশ্বের ছবি দেখায়। রাতের আকাশে তাকিয়ে থাকলে লক্ষ্য কোটি তারকা, উল্কা পিণ্ড দেখা যায়। আকাশকে চেনা সহজ নয়, আকাশ দিনে আকাশ কিন্তু রাতে মহাকাশ।’
.
.
ঘণ্টাখানেক হেঁটে চলার পর ইওন এসে তীরে পৌঁছাল। ততক্ষণে ভোর হয়ে গেছে। তীরে এসে ইওন থমকে দাঁড়াল। চোরা বালির উপর উবু হয়ে পড়ে আশা একটা মানব দেহ। সে দেহটার পিঠে হাত দিলো। শরীর গরম, বুকের ভেতরটা ধুকধুক করছে। বেঁচে আছে উবু হয়ে পড়ে থাকা মানব দেহটা। ইওন দেহটা ঘুরিয়ে সোজা করল। অচেতন হয়ে আছে লোকটা। লোকটাকে সেভাবে ফেলে রেখে সে নিজের তলোয়ার খুঁজতে লাগল। লোকটা থেকে ফুট তিনেক দূরে সে তার তলোয়ার খুঁজে পেল। নিজের তলবারি হাতে নিয়ে সে লোকটার নিকট এগিয়ে গেল। উটের পিঠে লোকটাকে তুলে নিয়ে সে আবার মরুভূমির দিকে যেতে লাগল।
ঘণ্টাখানেক পর লোকটার জ্ঞান ফিরল। চোখ মেলে লোকটা নিজেকে উটের পিঠের পেয়ে অবাক হলো।
_ “এ…আমি কোথায়?’’
ইওন লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটা মরুভূমি, সাহারা মরুভূমি।’
_ “তুমি আমাকে মরুভূমিতে নিয়ে এলে কেন? কে তুমি?’’
উটে দাঁড় করিয়ে ইওন লোকটার দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলল, ‘অদ্ভুত তো! আমি তোমাকে এখানে কেন আনব? তুমি সমুদ্রের পাড়ে অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলে। এরপর আমি তোমাকে উটের পিঠে করে নিয়ে এলাম।’’
_ “সমুদ্রের তীর? এরপর মানে আমি সাহারা মরুভূমিতে?’’
_ “একদম ঠিক ধরেছ। তা তুমি এখানে কী করে এলে?’’
_ “আসলে…’’ ছেলেটা থেমে গেল। কিছু একটা ভেবে সে বলে উঠল, ‘আমার নাম ফারহান। তোমার নাম?’
_ “আমি ইওন, ইওন ফেডার উইল।’’
উটের পিঠ থেকে ফারহান নেমে গেল। ইওনের পাশে এসে সে হাঁটা ধরল। ইওন আবার প্রশ্ন করল, ‘এখানে কী করে এলে? তোমার মুখভঙ্গি বলছে তুমি মরুভূমিতে আসোনি, আচমকা নিজেকে এখানে দেখে তুমি অবাক হও। সবুজ, শ্যামলা কোন অঞ্চলের বাসিন্দা তুমি, তোমার গায়ের বর্ণ তাই বলছে।’
ইওনের কথা শুনে ফারহান তার দিকে মুখ হা করে চেয়ে রইল।
_ “বাহ্! তীক্ষ্ণ দৃষ্টি! কী করে বুঝে গেলে?’’
_ “ইওন মুখের ভঙ্গি দেখেই মানুষ চেনে ফেলে।’’
_ “আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?’’ প্রশ্ন করল ফারহান।
_ “মরুভূমির প্রায় মাঝের দিকে চলে এসেছি আমরা। আপাতত মরুভূমির মাঝে থাকা চোখের মতো জায়গাটায় বিশ্রাম নেবো। এরপর বাকি পথটা যাবো। তা তুমি কোথায় যাবে সেটা তোমার ব্যাপার।’’
_ “চোখের মতো জায়গা? ওটাকে আই অফ সাহারা বলে।’’
ইওন থামল। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে সে বলল, ‘সেই কখন থেকে তুমি কথা ঘুরাচ্ছ। আমি জানতে চেয়েছি তুমি এখানে কী করে এলে?’
_ “আমি যা বলব তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’’
ইওন চোখ রাঙ্গিয়ে ফারহানের দিকে তাকালো। ফারহান ঢোক গিলে বলল, ‘আমার ঘটনাটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে । তবে এটাই সত্য।’
_ “বলো। ’’ স্থির গলায় বলল ইওন।
_ “আমি বঙ্গোপসাগরে ছিলাম। আচমকা একটা ঝড় ওঠে। ঝড়ের মধ্যে আমি ফেসে যাই। এরপর একটা বজ্র আমার গায়ে আঘাত করে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তারপর এখানে চলে আসি।’’
হাঁটতে হাঁটতে ততক্ষণে তারা আই অফ সাহারাতে চলে এসেছে। ইওন নিজের হাতে থাকা তলোয়ার ফারহানের গলায় ধরল।
_ “কে তুমি? তোমার পরিচয় কী?’’ গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল ইওন।
_ “আ…আমি আমার নাম তো বলেছিই।’’ তলোয়ার গলায় দেখে ভয়ে কাঁপা গলায় বলল ফারহান।
_ “তোমার জন্ম কত সালে?’’
ফারহানের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। সত্যটা সে বলতে পারবে না। আর মিথ্যে বললে ইওন বুঝে যাবে।
ইওন তলোয়ার নামিয়ে ফারহানের মুখের সামনে নিজের মুখ এনে বলল, ‘তুমি সাধারণ মানব নও। তোমার কালচে চোখের মণি সাধারণ চোখের মণির মতো কালো নয়। এই চোখ বলছে তুমি শত শত বছর অন্ধকারের জন্যে ছিলে।’
ফারহান কিছু বলতে নিলো তার আগেই ইওন তার তলোয়ার দিয়ে ফারহানের গালে আঁচড় কাটল। ফারহানের গাল থেকে কালচে রক্ত বেরিয়ে এলো। ইওন ঘাড় বাঁকা করে বলল, ‘এখনো কী মিথ্যে বলবে?’
ফারহানের কাটা গাল তৎক্ষণাৎ সেরে উঠল। ফারহান গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমার বয়স কত তা আমি নিজেই ভুলে গেছি। এই মরুভূমিটা দেখতে পাচ্ছ? কেমন নির্জন? এই মরুভূমিতে সমাগম হওয়া, একটা সভ্যতার ধস নামা, নতুন করে মিশরের জন্ম তার আগে আমার জন্ম। আমি সাধারণ কোন মানুষ নই, আমি অমর। আমার দেহের শিরা উপশিরার কালো রক্ত প্রবাহিত হয়। পবিত্র দেহে অপবিত্র কালো রক্ত।’
_ “আমিও তোমার মতই অমর। আমি ইওন, মিশরের জন্মের একদম শুরুতে আমার জন্ম। আর হাজার বছর ধরে এই মরুভূমিতেই আমি বাস করছি। বহিবিশ্বে কী ঘটছে না ঘটছে তা দেখার সময় আমার নেই। আমি মিশরের রক্ষা করি, মরুর রক্ষ করি। রক্ষক বলতে পারো। রক্ষা করেই যাবো।’’
_ “সন্দেহ ছিল তুমি হাজার বছর ধরে মরুভূমিতে বসবাস করো। কারণ তুমি মরুভূমিতে এসেও জানো না চোখের মতো দেখতে এই জায়গাকে আই অফ সাহারা বলে।’’
আই অফ সাহারাতে এসে ফারহান এবং ইওন পানি পান করল। এবং সেখানকার চুপসে যাওয়া কাঁদা মাটির পাড়ে তারা বসে পড়ল। ইওন তার সম্পর্কে বিস্তারিত ফারহানকে। পরিচয় দেওয়া শেষে ইওন বলল, ‘তোমাকে দেখে মনে হয় না তুমি জেলে। বঙ্গোপসাগর নামেই সাগর রয়েছে। তুমি সাগরে কেন গিয়েছিল?’
_ “একটা রহস্যের খোঁজে বেরিয়েছি আমি। দাঁড়াও একটা জিনিস দেখাই।’’
ফারহান পকেট থেকে একটা কাগজ আর দুটো ছবি ইওনকে দেখাল। ইওন ছবি আর কাগজের লিখাটা পড়ে বলল, ‘কাগজের লেখা মোতাবেক প্রাণীটা আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে রয়েছে। কিন্তু কাগজের একটা লিখার মানে আমি বুঝিনি। সেটা হলো আলো, অন্ধকার, বালু, মরুভূমি, ধূলিস্বাদ, চোখে, আড়ালে-অন্তরে জগত, মহাজগৎ নিয়ে যাবে তোমার গন্তব্যে।’
ইওন যেই লিখাটা বুঝেনি নিই সেই লিখাটা ফারহান হুট করেই বুঝে গেল। তার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। সে বর্তমানে মরুভূমিতে রয়েছে। বাক্যটির তিন নম্বর শব্দটি ছিল বালু এরপর ছিল মরুভূমি।
ফারহান গম্ভীর গলায় ইওনকে বলল, ‘ইউ আর দ্যা ফেডার উইল!’
ইওন ভ্রু কুচকাল। হঠাৎ ফারহানের কী হলো সে বুঝতে পারল না। ফারহানের চোখের সামনে একটা দৃশ্য ভেসে উঠল। ফেডার উইল নামক এক লোক পিছন থেকে তার বুকে তলোয়ার ঢুকিয়ে দিয়েছে। মারা যায় সে। শত বছর আগের মরিচা পড়া এক স্মৃতি! তখন ফারহান মরুভূমিতে এক যুদ্ধের ময়দানে ছিল।
ইওন ফারহানের নাম ধরে ডাক দিয়ে বলল, ‘কী হলো তোমার?’
ফারহান সতর্ক হয়ে গেল। সে ওঠে দাঁড়িয়ে গেল। বিড় বিড় করে সে বলে উঠল, ‘সেই লোকটা এই কাগজটা আমাকেই দিতে চেয়েছিলেন। কাগজের প্রতিটা বাক্য আমার জন্যে। আমার জন্যে লিখেছেন তিনি। কিন্তু চিনতেন না আমাকে। দেখেননি কখন।’
ইওন ওঠে দাঁড়িয়ে ফারহানকে বলল, ‘কিহ! এসবের সাথে তোমার যোগ সূত্র কী?’
ইওনের মুখ দেখে আচমকা ফারহান ভয় পেল। সে নিজের আসল মহাজাগতিক রূপে এলো। ইওন ফারহানের মহাজাগতিক রূপ দেখে থমকে দাঁড়াল। তার পুরো দেহটা কেঁপে উঠল। তার হাতে থাকা তলোয়ারটা হাত থেকে খসে পড়ে গেল। ইওন চিৎকার দিয়ে বলল, ‘তুমি…..!’
চোখের পলকের মধ্যে ইওন তার তলোয়ার দিয়ে ফারহানের গলা থেকে মাথাটা আলাদা করে দিলো। ফারহানের দেহটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কাটা গলা দিয়ে ফিনকি দিয়ে কালো রক্তের ধারা আই অফ সাহারার জলে মিশে গেল। জায়গাটা কেঁপে উঠল। কৃত্রিম চোখ আবার জীবিত হতে লাগল। চোখের মণির মাঝে দৌড়ে গেল ইওন। এবার সে কী দেখতে চলেছে অবশ্যই তাকে জানতে হবে।
ফারহানের কাটা মাথাটা বলে উঠল, ‘কাগজ কথাটা সত্যি হতে চলেছে। The reality will become a dream and the darkness will become the light.’
চোখের মণির মতো জায়গার মাঝে আসতেই ওপরে থাকা বিশাল বড় পাথরের খণ্ডটা চোখের পাতায় ন্যায় পলক ফেলল। ইওনের সামনে থাকা আলোকিত জগতটা অন্ধকারে ঢেকে গেল।
দূর থেকে ফারহানের কাটা মাথা আবার বলে উঠল, ‘যা ঘটবে তা দেখে ভেঙে পড়ো না ফেডার উইল। কারণ সামনে আটলান্টিসরা যখন জাগবে তখন আমার তোমার সহায়তার প্রয়োজন হবে।’
চলবে…

0 Comments