#Lost_City_Of_Atlantis
লেখক:#শাহরিয়ার_হাছান
পর্ব-৫

_ “স্যার, আপনি এভাবে রবার্টের লাশ কবর থেকে তুলতে পারেন না। আমি চাই না তার দেহে কাটা ছেঁড়ার দাগ পড়ুক।’’ রবার্টের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অফিসারের কাছে অনুরোধ করল চার্লস।
অফিসার রবার্টের কথায় কান না দিয়ে তার সহকর্মীদের নির্দেশ দিলেন কবর খুঁড়ার কাজ শুরু করতে। চার্লস বাধা দিলো, বাধা দিয়ে সে বলল, ‘আমি বা রবার্টের চেনা জানা কেউ তো মামলা করেনি। তাহলে রবার্ট লাশ কবর থেকে তুলে আনার অধিকার আপনাকে কে দিলো?’
অফিসার একটা কাগজ চার্লসের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কোর্ট থেকে নির্দেশ নিয়েই এসেছি। এর জন্যে আমার চৌদ্দ দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। এখন আর বিলম্ব করা যাবে না।’
_ “কিন্তু রবার্টের লাশ দিয়ে আপনি কী করবেন?’’ প্রশ্ন করল চার্লস।
এই প্রথম অফিসার চার্লসের কথায় কর্ণপাত করলেন। ঘুরে তিনি চার্লসের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘রবার্টের মৃত্যু অস্বাভাবিক ছিল।’
অফিসারের কথা শুনে চার্লসের মুখ চুপসে গেল। কাঁপা গলায় সে বলল, ‘ক..কে বলেছে…অ..অস্বাভাবিক?’
অফিসার ভ্রু কুচকে বললেন, ‘কেন তুমি জানা না?’
চার্লস অফিসারের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস পেল না। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে অফিসার সবকিছু সম্পর্কে অবগত। বেশ কিছু দিন যাবৎ তিনি হয়তো মাঝ সমুদ্রে নাবিক অদৃশ্য হওয়া এবং অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে তদন্ত করে চলেছেন। মুখ নিচের দিকে নামিয়ে সে বলল, ‘না, আমি তো কিছুই জানি না।’
_ “রবার্টের মৃত্যু আর ক্যাপ্টেন জুলবার্গ উভয়ের মৃত্যু একইভাবে হয়েছে। উভয়ের শরীর মৃত্যুর পর স্বাভাবিকের তুলায় মাত্রাতিরিক্ত ঠাণ্ডা ছিল। হয়তো কোন ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগ করে উভয়কে হত্যা করা হয়েছে। আমার ধারণা মাত্র, তাই রবার্টের লাশ পোস্টমর্টেম করা অত্যাবশ্যক।’’
চার্লস খানিকটা অফিসারের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। এরপর সে মৃদু গলায় বলল, ‘এই রহস্যটা উদ্ঘাটন আমিও করতে চাই। আমি আপনাকে সহায়তা করব, আমি যা যা জানি সবটা আপনাকে বলব। কিন্তু এক শর্তে, রবার্ট লাশ পোস্টমার্টম করবেন না।’
_ “পোস্টমর্টেম না করলে তো রহস্য উদ্ঘাটন হবে না।’’
_ “আমি জানি রহস্যটা।’’ শান্ত গলায় বলল চার্লস।
অফিসার তার সহকর্মীদের থামার নির্দেশ দিলেন। কবরের উপর থেকে সরা মাটিগুলো আবার কবরের উপর দেওয়া হলো। অফিসার চার্লসের বাড়িতে গেলেন।
চার্লস অফিসারের দিকে ক্যাপ্টেন জুলবার্গের ডায়েরীটা এগিয়ে দিলো। এরপর পূর্বে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা সে বর্ণনা করল। সবকিছু শুনে অফিসার বললেন, ‘অপার্থিব প্রাণী এসব করছে তাই তো?’
_ “একদম ঠিক।’’
_ “কিন্তু তোমার কথা আমি কেন বিশ্বাস করব? এমনও তো হতে পারে তুমিই ক্যাপ্টেন এবং রবার্টকে মেরেছে? কারণ দুই যাত্রাতেই তুমি তাদের সঙ্গে ছিলে।’’
চার্লস এক গাল হেসে বলল, ‘কৌতুকটি সত্যিই মজাদার ছিল। এই এক বছরে সাতাশ জন নাবিক মাঝ সমুদ্র থেকে গায়েব হয়েছেন। দু'জন লোক শুধু বন্দরে ফেরার পর মারা যান। মাঝ সমুদ্রে গিয়ে নাবিকদের আমি অপহরণ করেছি? আর ক্যাপ্টেন জুলবার্গ এবং রবার্টের সাথে ইহকালে আমার কোন ঝগড়া হয়নি। রবার্ট আমার ভালো বন্ধু ছিল। আর ক্যাপ্টেন আমার আইডল ছিলেন।’
_ “তোমার বলা যুক্তিটা সঠিক। কিন্তু অপার্থিব কোনো প্রাণী পৃথিবীতে আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। তবে আমাকে কোনো শক্তপোক্ত প্রমাণ দেও, যাতে আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হই। ’’
_ “প্রমাণ আপনার হাতে রয়েছে। ক্যাপ্টেন জুলবার্গের ডায়েরীর শেষের লিখাগুলো বলে দিচ্ছে ক্যাপ্টেনের মৃত্যুর জন্যে অপার্থিব বলেন কিংবা মহাজাগতিক প্রাণী বলেন, প্রাণীটাই সবকিছু করেছে।’’
_ “কিঞ্চিৎ সত্যতা রয়েছে তোমার কথায়। তবে তোমার বয়ান পুরোপুরি বলতে পারছে না কাজটা প্রাণীটার কিনা।’’
_ “খোঁজ নিলে বাকিটুকুও জানা যাবে। তো আপনি রহস্য উদঘাটনে আমাকে সহায়তা করবেন?’’
_ “অবশ্যই!’’
অফিসার উঠে দাঁড়ালেন, চার্লস বুঝল তিনি চলে যাবেন। চার্লস অফিসারকে দরজা অবধি এগিয়ে দিলো। অফিসার বললেন, ‘বন্দরে যাচ্ছি, দেখে আসি বন্দরের অবস্থা কেমন।’
চার্লস কিছু বলল না, হ্যাঁ সূচক উপর থেকে নিচে মাথা নাড়াল। অফিসার বিদায় নিলেন।
.
.
সমুদ্রের তলদেশে একটা উজ্জ্বল বস্তু দেখা যাচ্ছে। যেন লাঠির মাথায় রূপোর তৈরি সু-চালো পাথর বাঁধা। সেটাকে ঘিরে একটা অদ্ভুত প্রাণী ঘুরছে। বিচ্ছিরি, স্যাঁতসেঁতে প্রাণী। আচমকা প্রাণীটা গর্জে উঠল। প্রাণীটা থেকে কয়েক শত ফিট উপর দিয়ে চলা জাহাজে গিয়ে শব্দটা আঘাত করল। তৎক্ষণাৎ জাহাজটা কেঁপে উঠল, দুলতে লাগল। জাহাজের কিনারে থাকা নাবিকেরা ধপাস করে সমুদ্রের জলে পড়ে গেল। তারা সাঁতার কাটার চেষ্টা করল, কিন্তু উত্তাল সমুদ্রের এক ঢেউই তাদের নাস্তানাবুদ করে দিলো। সমুদ্রের পানির নিচে তারা চলে গেল। আর তারা উঠতে পারল না, কারণ পানির নিচে থাকা পানিটা তাদের পা ধরে টেনে পানির গভীরে নিয়ে গেছে। আর তারা ফিরবে না, তারাও সেই অজ্ঞাত মহাজাগতিক প্রাণীর শিকারে পরিণত হলো।
.
.
বন্দরে এসে অফিসার থমকে দাঁড়ালেন। বন্দরে একটা হই-চই জমেছে। কয়েকজন লোকের মুখ থেকে তিনি জানতে পারলেন শিপ.এ.কে.সেভেন আচমকা দুলতে শুরু করে। শিপের অর্ধ সংখ্যক নাবিক সমুদ্রের জলে পড়ে যায় ,এরপর আর তাদের হদিস পাওয়া যায়নি।
উদ্ধার কর্মীরা স্পিড বোর্ড নিয়ে ইতিমধ্যে বেরিয়ে পরেছে। পুরো ঘটনার বর্ণনা শুনে অফিসারের মনে খটকা জাগল।
_ “বিনা ঢেউ, বিনা ঝড়ে জাহাজ দুলার কথা নয়। তাহলে কি চার্লস কথাগুলো সত্য? আসলেই কোনো মহাজাগতিক প্রাণী এসব করছে?’’ মনে মনে নিজেকে নিজে বললেন অফিসার।
.
.
_ “আমার নাম ইওন ফেডার উইশ। কয়েক শত বছর পূর্বে এই নাম সকলের মুখে মুখে ছিল। কলের গহ্বরে এখন নাম তলিয়ে গেছে। আমি নিজেই ইতিহাসের পাতা থেকে নিজের নাম মুছে দেই। আমার নিজের সময়ে  এক নিকৃষ্ট ফারাও বাদশা ছিল। যত প্রকার পাপ কাজ হতো সব জায়গায় তার নাম ছিলই ছিল। পরবর্তীতে আমি তাকে হত্যা করি, কিন্তু ভুলবশত তারই বানানো অমরত্বের মন্ত্রের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অমরত্ব লাভ করি। সিদ্ধান্ত নেই অমরত্ব যখন লাভ করেছিই, তখন মিশরের রক্ষাই না হয় করি। নিজ জন্মভূমির রক্ষার শপথ নেই। ইতিহাসের পাতা থেকে প্রথমে আমার বীরত্বের কাহিনি মুছে দেই। এরপর মিশরের উপর আশা প্রতিটা বিপদ আমি লুকিয়ে মোকাবেলা করি। মানুষকে নানান রকম বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করি। গিজার গ্রেট তিনটে পিরামিড সংলগ্নে ছিল আমার নগরী। আধুনিক মায়াবী, মায়া সভ্যতা। কিন্তু আচমকা আমার কিছু প্রহর অনুপস্থিতে রহস্যজনক ভাবে আমার পুরো নগরী ধূলিস্বাদ হয়ে যায়। কে বা কারা এমনটি করেছে এত শত বছর ধরে সেই উত্তর আমি খুঁজে পাইনি। কিন্তু ছয় মাস পূর্বে ‘আই অফ সাহারা’ এর চোখের মণির মতো স্থানে যাওয়ার পর আমার প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়ে যাই। সেদিন সেই স্থানে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকানোর পর লক্ষ্য করি আমার সভ্যতার সাথে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিরি ঘটনাগুলোর চিত্র ফুটে উঠছে। ঝাপসা ছিল চিত্রগুলো! আমি সেই স্থানে হাঁটতে শুরু করি, যাতে আকাশে দৃশ্যটা দেখতে পাই। আচমকা একটা কাটায় আমার পা বিঁধে যায়। পায়ের রক্ত ভূমিষ্ঠ হতেই পুরো চোখের মতো জায়গাটা বদলে যায়। চোখটা জেগে উঠে, দেখিয়ে দেয় আমাকে সেদিন কী হয়েছিল। আমি দেখি মহাজাগতিক এক প্রাণী আমার সভ্যতা ধ্বংস করেছে। দৃশ্যটা শেষ হয়ে গেল। চোখটা আবার কৃত্রিম হয়ে গেল। অতীতে ঘটে যাওয়া হৃদয় বিদারক ঘটনা আমি স্বীকার করে নিলাম। সেই স্থান ছেড়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। ’’
.
.
 সাহারা মরুভূমির শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়ে আছে ইওন। সামনে শান্ত সমুদ্র। ইওন ভালো করে জানে তার হাতের বাঁ দিকে হলো মহাসমুদ্র আটলান্টিক। আটলান্টিকের শীতল বায়ু সে অনুভব করছে। এই মহাসমুদ্রের অতলে লোক চক্ষুর আড়ালে অনেক অজানা সভ্যতা দাফন হয়ে আছে, তা ইওন বেশ ভালো করেই জানে।
ইওন সমুদ্র থেকে এক মুঠো জল হাতে নিয়ে বলল, ‘আকাশ নীল, সমুদ্রও নীল। নীল আকাশ মহাবিশ্বের রহস্য পৃথিবী থেকে আড়াল করে রাখে, আর নীল সমুদ্র পানির নিচে থাকা রহস্য আড়াল করে রাখে। সমুদ্রের নোনা জলে ইওন গা ভিজিয়ে নিলো।
_ “জায়গাটা পূর্বে আমি চিনতে পারিনি। কিন্তু এখন আমি চিনতে পেরেছি। সাহারা মরুভূমিতে থাকা চোখের মতো অংশটা কিভাবে হলো সেটা বেশ ভালো করে বুঝতে পারছি। সবকিছু আগের মতো নেই, সব বদলে গেছে।’’
ইওন হাঁটা ধরল। তার উদ্দেশ্য মিশরে ফিরে যাওয়া।
.
.
_ “ছয় মাস ধরে মানসিক অশান্তিতে ভুগছি আমি। ওই লোকটার কাগজের লেখনী প্রতিদিন ভাবায় আমাকে। আটলান্টিক মহাসাগরে যদি প্রাণীটা থেকে থাকে তাহলে তো সমুদ্র পথে যাওয়া জাহাজগুলোর ক্ষতি হতে পারে। তাছাড়া প্রাণীটা যদি লোক চক্ষুর আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে? যদি প্রাণীটা আচমকা আক্রমণ করে বসে? হাজার হাজার প্রাণ বিপর্যয়ে ফেলে রেখে আমি এখানে এখনো কেন আছি?’’ নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে চলল ফারহান।
_ “না, গিয়ে একবার দেখেই আসি।’’ নিজেকে নিজে বলল ফারহান।
_ “কিন্তু আটলান্টিক মহাসাগরে যেতে হলে প্রতিটা দেশের সিকুরিটি ফাঁকি দিয়ে যেতো হবে। সেক্ষেত্রে কয়েক দিন ধরে আমাকে পরিকল্পনা করতে হবে। সব থেকে ভালো পথ হয় সমুদ্র পথ। সেখানে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা ভূমির তুলনায় অনেকাংশে কম।’’
ফারহান ওঠে গিয়ে ব্যাগ পত্র গুছাতে শুরু করল।
_ “মানসিক শান্তি দৈহিক শান্তির ঊর্ধ্বে। তাই নিজের মনকে শান্ত রাখতে হলে সেই প্রাণীটিকে সচোক্ষে দেখতে হবে, পরাস্ত করতে হবে। আটলান্টিক মহাসাগর আমার আগমনের জন্যে প্রস্তুত থাকো।’’
ঠিক সেই সময় ফারহানের ফোনটা বেজে উঠল। তার মাথা পুরো গরম হয়ে উঠল। বিড় বিড় করে সে বলে উঠল, ‘ইমোশনে হাত দেওয়া অনুচিত। কোন হতচ্ছাড়ায় যে কল দিলো!’
ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ বলে উঠল, ‘করোনা থেকে বাঁচতে নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করুন। কিছুক্ষণ পরপর হ্যাণ্ডওয়াশ দিয়ে অন্তত বিশ সেকেণ্ড ভালো করে হাত ধুয়ে নিন। হাঁচি-কাশির সময় রুমাল দিয়ে নাক মুখ ঢেকে নিন। সামাজিক মেলামেশা থেকে দূরে থাকুন…’
ফারহান ফোনটা কেটে দিলো। ফোনটা সে খাটের উপর রেখে ব্যাগ গুছাতে লাগল। কিছুক্ষণ পর ব্যাগ গুছানো শেষ হতেই সে নিজের পরিধেয় পোশাক পরিবর্তন করে নিলো। দ্রুত সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরল।
চলবে….
ওহ! হ্যাঁ, আপনারা আবার ফারহানের মতো কাণ্ড করবেন না। পরে কিন্তু করোনা আপনার প্রেমে পড়ে ঝাপটে ধরবে। তখন কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবেন না। নিজ ঘরে অবস্থান করুন আর আমার গল্প পড়ুন। চিল্লায়ে বলেন ঠিক কিনা?