#Lost_City_Of_Atlantis
লেখক:#শাহরিয়ার_হাছান
পর্ব-১১

তীব্র ঝড় উঠেছে সমুদ্রে। সেই ঝড়ের সাথে মিলিয়ে গেল দুটি মানব দেহ। শামীম আর চার্লস আটলান্টিক মহাসাগরের জলরাশির অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল। কিছু একটা তাদের পা চেপে ধরেছে, টেনে নিয়ে চলেছে সমুদ্রের তলদেশে। তাদের দম ধীরে ধীরে বন্ধ হচ্ছে। অক্সিজেনের অভাবে তাদের সারা শরীর ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যেতে লাগল। মৃত্যু সুনিশ্চিত তা তারা ইতিমধ্যে বুঝে গেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তারা এখনো প্রাণীটির মুখ কিংবা সারা দেহ দেখতে পায়নি। হয়তো আর দেখতেও পাবে না। আর কয়েক সেকেণ্ড জীবিত থাকবে তারা। এরপর তারা পাড়ি জমাবে মৃত্যুপুরীতে।
.
.
ধীরে ধীরে চোখ খুলল চার্লস।
_ “আমি বেঁচে আছি?’’ নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল চার্লস। হঠাৎ তার কাছে মনে হলো সে ক্যাপ্টেন জুলবার্গের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে সে চারিদিক দেখতে লাগল।
বাম পাশে তাকাতেই থমকে গেল চার্লস। তার ঠিক বাম পাশে দাঁড়িয়ে আছেন ক্যাপ্টেন জুলবার্গ। চার্লস প্রচণ্ড ভয় পেল। ক্যাপ্টেন তা বুঝতে পেরে চার্লসকে বলল, ‘ভয় পেও না। আমি আসল ক্যাপ্টেন জুলবার্গ। আমি মৃত, সেই সাথে তুমিও।’
মৃত! কথাটা শুনেই চার্লসের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। তার মানে সে মারা গেছে? আর এটা মৃত্যুপুরী।
ক্যাপ্টেন জুলবার্গ বলে উঠলেন, ‘এটা মৃত্যুপুরী নয়। আমরা আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে বন্দি হয়ে আছি। আমাদের বন্দি করে রাখা হয়েছে। এখানে আমাদের মতো বহু আত্মা রয়েছে। সেই প্রাণীটা আমাদের বন্দি করে রেখেছে।’
সবকিছু বুঝতে চার্লসের কিছুটা সময় লাগল। মিনিট কয়েক পর চার্লস বলে উঠল, ‘কী সব হচ্ছে আমাকে একটু খুলে বলেন।’
ক্যাপ্টেন হাতের ইশারায় চার্লসকে সামনের দিকে তাকাতে বলল। চার্লস সামনের দিকে তাকাতেই থমকে দাঁড়াল। স্বর্ণের তৈরি পোষাক পরিধেয় এক লোক ত্রিশূল হাতে বসে আছে। ক্যাপ্টেন জুলবার্গ বলে উঠলেন, ‘আটলাস, পসাইডনের পুত্র সে। তাকে জীবিত করার জন্যে আমাদের আত্মা বন্দি করেছে সেই প্রাণীটা।’
_ “মানে?’’ প্রশ্ন করল চার্লস।
_ “আমার ডায়েরী নিশ্চয়ই পড়েছ। সেখানে মাত্রা নিয়ে আমি বলেছি, আটলাসের মতো সকলেই হলো উচ্চ মাত্রার প্রাণী। পসাইডন থেকে শুরু করে সবাই। যার ফলে তারা প্রকৃতির অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। আটলাস বহু বছর ধরে এভাবে বসে আছে। বলতে পারো সে মারা গেছে। কিন্তু আটলাসের পোষা প্রাণী এতদিন বন্দি ছিল। বছর খানেক আগে ছাড়া পেয়ে মানবের রুহ বন্দি করা শুরু করে। যাতে আটলাসের রুহ মৃত্যুপুরী থেকে সে নিয়ে আসতে পারে, বিনিময়ে মানুষের রুহ দিবে সে। বলতে পারো মৃত্যুপুরীকে ধোঁকা দেওয়া। একজনের স্থানে আরেকজনকে বসিয়ে দেওয়া।’’
_ “আমাদের মুক্তি মিলবে কী করে?’’ প্রশ্ন করল চার্লস।
_ “আটলাসের এই মৃতদেহ আর প্রাণীটাকে হত্যা করতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমরা তা করতে পারব না। কারণ আমরা মুত, আমাদের ভৌতিক কোন অস্তিত্বই নেই।’’ নিচু স্বরে বলল ক্যাপ্টেন।
_ “তাহলে এখন কী করব?’’
_ “আশায় আশায় বসে থাকা। কোনো একদিন কেউ আসবে আর প্রাণীটাকে হত্যা করবে, সাথে আটলাসের দেহ ধ্বংস করবে।’’ বলল জুলবার্গ।
_ “কিন্তু এর মধ্যে যদি প্রয়োজনীয় আত্মা প্রাণীটা সংগ্রহ করতে পারে তাহলে তো আটলাস জীবিত হয়ে উঠবে। তখন?’’ প্রশ্ন করল চার্লস।
_ “তখন পৃথিবীতে রাজত্ব করবে আটলাস। কিন্তু তা কখনই হবে না। কারণ দু'জন মহাজাগতিক উচ্চ মাত্রার মানবদের আমরা আটলাস আর প্রাণীটার অতীত দেখাচ্ছি।’’
_ “মানে?’’ প্রশ্ন করল চার্লস।
_ “আটলাসের সামনে পড়ে থাকা দুটো দেহের দিকে লক্ষ্য করো। পানির নিচে কয়েক দিন ধরে দেহগুলো পড়ে আছে। কিন্তু পচন ধরেনি, কাছে গেলে দেখবে হৃদসপন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ওদের আমরা সকল আত্মারা মিলে আটলাসের অতীত দেখাচ্ছি।’’
_ “আমরা?’’ প্রশ্ন করল চার্লস।
ক্যাপ্টেন জুলবার্গ চার্লসকে পিছনে ফিরতে বলল। চার্লস পিছনে তাকিয়ে তার মতো হাজার হাজার মানুষকে দেখতে পেল। সবাই মৃত, সকলের আত্মা বন্দি।
চার্লস এখনো পরিপূর্ণ ভাবে বুঝতে পারল না কী ঘটছে এখানে।
.
.
 পসাইডন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ফারহানের দিকে। সন্দেহ জন্মাচ্ছে তার মনে।
_ “তুমি কোন গ্রহ থেকে এসেছ? আশপাশের কোনো গ্রহে তো তোমার মতো কাউকে আমি দেখিনি।’’ বলল পসাইডন।
ফারহান কিছু বলে উঠার আগেই আটলাস বলে উঠল, ‘এসব নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করি? পিতা, আপনাকে কিছু দেখার ছিল। বিশেষ কিছু, আপনার সম্মার্থে আমি কিছু নির্মাণ করেছি। জল, ভূমিকম্প এবং অশ্বের দেবতা হিসেবে আপনার জন্যে সমান্য একটি নির্মাণ।’
আটলাস পসাইডনকে তার সাথে নিয়ে যেত লাগল। তাদের পিছন পিছন যাচ্ছে ফারহান এবং ইওন। তারা শহরে মাঝে এসে পৌঁছাল। শহরের মাঝে বিশাল এক মন্দির। মন্দিরের উপরিভাগ আকাশ ছুঁয়েছে। আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন যদি কারো থাকে তবে তাদের উচিত এই মন্দিরের চুড়ায় ওঠা। তবে পা পিছলে পড়ে গেলে কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।
মন্দিরের মাঝে বিশাল একটা মূর্তি। পসাইডনের মূর্তি। রথের উপরে বসে আছে সে। রথ হলো একটি ঘোড়া।
আটলাস তার পিতার উদ্দেশ্যে বলল, ‘বাবা, সম্প্রতি তোমাকে অশ্বের দেবতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কারণ তুমি ঘোড়া সৃষ্টি করেছে। সবচেয়ে সুন্দর দ্রুতগতি সম্পন্ন চতুষ্পদী প্রাণী। সেই সুবাদে তোমার জন্যে এই মূর্তি আমি বানিয়েছি।’

পসাইডন মৃদু হাসল। হেসে তিনি বলল, ‘আমি তোমার উপর খুব খুশি হয়েছি। আমার দ্বারা সৃষ্ট প্রথম অশ্ব আমি তোমাকে উপহার হিসেবে দিচ্ছি।’
পসাইডন প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন তার অশ্ব নিয়ে আসতে। দ্রুত প্রহরীরা পসাইডনের অশ্ব নিয়ে এলো। ইওন অশ্বটা দেখে বলল, ‘এত সুন্দর সাদা ঘোড়া আমি জন্মেও দেখিনি।’
_ “আমিও তো অবাক। একেই বলে অশ্বরাজ। আকারটা দেখেছ? অনেক বড়। সেই সাথে পেশিগুলো দেখো!’’ বলল ফারহান।
অশ্বের পিঠে চড়ে বসল আটলাস। পাশে থাকা প্রহরীরা বলল জয় মহারাজ আটলাসের জয়।
.
.
 আচমকা ফারহান এবং ইওনের সামনে থাকা দৃশ্যগুলো পাল্টাতে লাগল।
_ “কী সব হচ্ছে এসব?’’ প্রশ্ন করল ইওন। প্রত্যুত্তরে ফারহান কিছু বলল না। নতুন একটা দৃশ্য তাদের সামনে ফুটে উঠল। রাজ প্রসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে তারা। সামনে থাকা স্বর্গের নগরীতে যুদ্ধ হচ্ছে। সিভিলি ওয়ার অর্থাৎ নগরীতে বসবাস রত লোকেদের মধ্যাকার যুদ্ধ। আটলাসের প্রহরীরা একে অপরের সাথে যুদ্ধ করছে, সেই সাথে নগরীর লোকরা।
ফারহান গম্ভীর গলায় বলল, ‘আমরা কখনই অতীতে ফিরে আসিনি। এগুলো আমাদেরকে কেউ এমনভাবে দেখাচ্ছে যাতে আমরা মনে করি এসব বাস্তবে ঘটছে। আমাদেরকে আটলান্টিস শহরের ইতিহাস দেখানো হচ্ছে।’
ইওন কিছু বলল না। অশ্বের পিঠে বসে খাকা রাজা আটলাস নগরীর মাঝে গিয়ে ভূমিকম্প সৃষ্টি করল, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। সে ক্ষিপ্ত হলো, চিৎকার দিয়ে বলল, ‘পিতা…’
একটা ঝড় উঠল, ঝড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো পসাইডন। নগরীর অবস্থা দেখে সে রেগে গেল। আটলাসকে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছিল?’
_ “আপনি কয়েক বছর ধরে নগরীতে আসছেন না। নগরীর লোকেদের মধ্যে লোভ জন্মেছে। তাদের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়েছে। যা এখন যুদ্ধের রূপ নিয়েছে।’’
পসাইডন আটলাসের গালে চড় মেরে বললেন, ‘রাজা হয়েও সামলাতে পারলে না নিজের নগরী? এখন বলছ আমি আসছি না বলে নগরীর লোকরা খারাপ হয়ে গেছে? তোমাকে রাজা বানিয়েছি কেন?’
আটলাস রেগে গেল, সে বলে উঠল, ‘জলের দেবতা আপনি। লোকে আপনাকে পূজা করে। বছরের একটা সময়ে আপনি এলে মানুষ ভয়ে থাকে। পাপ কাজ থেকে দূরে থাকে। আমি আপনার মতো ওতো বড় দেবতা নই। আমার পূজা কেউ করে না, তাই আমার কথাও এখন কেউ শুনছে না। আপনি একবার বললেই এই বিদ্রোহ থেমে যাবে।’
পসাইডন চারিদিকে তাকাতে লাগল। নগরীর লোকেদের চোখে সে ঘৃণা, অহংকার, লোভ দেখতে পেল। সে কয়েকবার ভূমিকম্প সৃষ্টি করে নগরীর লোকেদের থামাতে চেষ্টা করল। কিন্তু সে ব্যর্থ হলো। রেগে গেল পসাইডন।
_ “আটলাস, নগরীটা আমি সমুদ্রের নিচে তলিয়ে দেবো। এরা আর আমাদের কথা শুনবে না। অবাধ্য হয়ে গেছে। অতি মেধা ওদের মনে অহংকার জন্মিয়েছে।’’
এই বলে পসাইডন তার ত্রিশূল মাটিতে স্পর্শ করাল। সাথে সাথে পুরো নগরী বাতাসে ভেসে উঠল। ধীরে ধীরে পুরো নগরী সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। তবে পসাইডনের এই কাজ সমর্থন করল না আটলাস। সে বলল, ‘পুরো নগর ডুবানো ঠিক হবে না। আশেপাশে দেখেন নগরীর সকল লোকেরা থেমে গেছে। যে যার মতো প্রাণ বাঁচানোর জন্যে ছুটছে।’
আটলাসের কথায় কান না দিয়ে পসাইডন উড়াল দিলো। আটলাস নিজের ত্রিশূল দিয়ে নগরী নিচে নামানোর চেষ্টা করল কিন্তু ব্যর্থ হলো সে। উড়াল দিয়ে সে তার পিতার পেছন পেছন যেতে লাগল। আটলাসের এমন কর্মকাণ্ডে পসাইডন ক্ষিপ্ত হলো। তার এত সন্তান রয়েছে, কিন্তু কেউ আজ পর্যন্ত তার মুখের উপর কথা বলার সাহস পায় নি। পসাইডন তার ত্রিশূল আটলাসের বুকে গেঁথে দিলো। লাথি দিয়ে তাকে জমিনে নিক্ষেপ করল। যেই স্থান হতে নগরী উঠেছে সেই স্থানে ছয়টি রং তৈরি হয়েছে। এই ছয়টি রিং এর মাটিতে আটলান্টিসদের বসবাস ছিল। আর ছয় রিং এর মাঝে পানি ছিল। মাঝের রিং এর চারিদিকে থাকা পানির নিচে তলিয়ে গেল সে। পসাইডন তাকে অভিশাপ দিলো, ‘তোমাকে আমি অভিশাপ দিলাম তুমি কখনো পানি থেকে উঠতে পারবে না। তোমার শহরের মাটি আজীবন তোমার ঘাড়ের উপর থাকবে।’
এই বলে পসাইডন তার ত্রিশূল ঠিক মাঝে নিক্ষেপ করল। আটলাসের ঘাড়ের উপর হাজার টন চাপ পড়ল। সে তার ত্রিশূল দিয়ে ধরে রাখল পুরো নগরীর ভার।
পসাইডন যেতে নিচ্ছিল, ঠিক তখনি একটা দৃশ্য দেখে সে থেমে গেল। তার সৃষ্ট প্রথম অশ্ব, অশ্ব রাজ ছুটে যাচ্ছে আটলাসের দিকে।
পসাইডন বলে উঠল, ‘তোকে সৃষ্টি করলাম আমি, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চতুষ্পদ প্রাণী বানালাম আর তুই আমার অবাধ্য হলি? আটলাসের প্রতি এত টান । তোকে আমি অভিশাপ দিলাম তুই হবি সৃষ্টিকুলের সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণী। আর তুই আটলাসের মতোই গভীর জলে বন্দি থাকবি।’
আকাশ থেকে একটা বজ্র অশ্বরাজের দেহে এসে লাগল। ধীরে ধীরে সে বিশাল এক বিচ্ছিরি দানবে পরিণত হলো। নিজের পায়ে হোঁচট খেয়ে  সে ছয় রিং এর মধ্যাকার পানিতে পতিত হলো। এই ছয় রিংই হলো বর্তমান সময়ের আই অফ সাহারা।
.
.
 মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে ইওন আর ফারহান। ইওন বলে উঠল, ‘পসাইডন মোটেও ভালো নয়। সে অসংখ্য বিয়ে করেছে, তার সন্তানের অভাব নেই। আর সে খুব রাগি। তাই তো বিদ্রোহ হওয়ায় পুরো নগরী ডুবিয়ে দিতে সে একবারও ভাবেনি। গ্রীক দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ঠুর হলো পসাইডন এবং পসাইডনের ভাই জিউস।’
ফারহান এবং ইওনের সামনে থাকা দৃশ্যটা বদলাতে লাগল। ধীরে ধীরে তারা দেখল তাদের সামনের জগতটা নীলচে হয়ে যাচ্ছে, সেই সাথে অন্ধকার তাদের গ্রাস করছে। মিনিট দুয়েক পর তার নিজেদের জলের নিচে পেল।

চলবে…