#Lost_City_Of_Atlantis
লেখক:#শাহরিয়ার_হাছান
পর্ব-১২

তাদের সামনে ট্রাইডেন্ট অর্থাৎ ত্রিশূল হাতে বসে আছে আটলাস। ফারহান সামনের দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক তখনি সাপের লেজের মতো কিছু একটা ফারহানের বুকে আঘাত করল। সে ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। ইওন দ্রুত দৌড়ে ফারহানের পাশে গেল। ফারহানকে সে ধরে ওঠে বসাল।
_ “জলের গভীরটা অন্ধকার নয়, বরং একটা বিশাল কুৎসিত প্রাণী রয়েছে এই জলের নিচে।’’ বলল ফারহান।
ইওন কিছু বলে ওঠার আগেই কিছু একটা তার পা চেপে ধরল। তাকে ছুড়ে দূরে ফেলে দিলো। অন্ধকারের ভেতর থেকে কোন প্রাণী তাদের আক্রমণ করছে সেটা এখনো তারা বুঝতে পারছে না। ধীরে ধীরে অন্ধকারের ভেতর থেকে দুটো উজ্জ্বল লাল চোখ দৃশ্যমান হলো। ফারহান তার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত গতিতে সেদিকে এগিয়ে যেতে লাগল।কিন্তু জলের নিচে হাওয়ার সে তেমন একটা দ্রুত বেগে এগিয়ে যেতে পারল না। ফলাফল প্রাণীটা আবার আক্রমণ করল। এবার ফারহান ছিটকে গিয়ে ইওনের পাশে গিয়ে পড়ল।
_ “এটাই মনে হয় আটলাসের অশ্ব। অশ্বরাজ, যে কিনা অভিশপ্ত হয়ে কুৎসিত প্রাণীতে রূপান্তর হয়েছে।’’ বলল ইওন।
_ “জলের কারণে গতি পাচ্ছি না। প্রাণীটা জলের প্রাণী, জলে তার সাথে সহজে আমরা পারব না। জলে আমরা দুর্বল।’’বলল ফারহান।
আবারও প্রাণীটা তাদের উপর আক্রমণ করে বসল। ফারহান কোনো উপায় না দেখতে পেরে ইওনের তলোয়ার নিয়ে সোজা অন্ধকারের দিকে ছুঁড়ে মারল। অন্ধকারের মধ্য থেকে একটা ক্ষীণ আর্তনাদের শব্দ এলো। সেই সাথে জলে টকটকে লাল রক্ত ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
ফারহান আর ইওন অন্ধকারের দলাটার দিকে এগিয়ে গেল। যত্রতত্র আক্রমণ করতে লাগল তারা। এভাবেই কেটে গেল কিছুক্ষণ।
রক্তে নীলচে জলরাশি রক্তিম বর্ণ ধারণ করল। পানির নিচে থাকা কুৎসিত কালো জীবটা মরে পড়ে আছে। প্রাণীটা আকারে বিশাল, অক্টোপাসের মতো অসংখ্য হাত। প্রাণীটি মরার সাথে সাথে পানির নিচ থেকে একটা কণ্ঠস্বর বলে উঠলাম, ‘আটলাসের দেহ ধ্বংস করে দেও তোমরা। লোক চক্ষুতে আটলাসের দেহটা আসলে বিপদ হবে।’
_ “কে আপনি?’’ প্রশ্ন করল ইওন।
_ “আমি শিপ.এক.কে.সেভেনের ক্যাপ্টেন, ক্যাপ্টেন জুলবার্গ। আমাকে এবং আমার মতো বহু নাবিকের রুহ এই প্রাণীটি বন্দি করে রেখেছিল আটলাসকে পুনরায় জীবিত করার উদ্দেশ্যে। আটলাসের দেহ নষ্ট হলে আমরা মুক্তি পাব।’’ বলে উঠল ক্যাপ্টেন জুলবার্গ।
ইওন ধীরে পায়ে আটলাসের মৃত দেহের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আটলাসের দেহ স্পর্শ করতেই ইওন আঁতকে উঠল। সে বলে উঠল, ‘পুরো দেহ তো অনেক আগেই পচে গলে গেছে।’
ইওনের হাতের স্পর্শ পেয়ে আটলাসের দেহে থাকা স্বর্ণের পোষাক খসে নিচে পড়ে গেল। স্বর্ণের পোশাকের নিচে থাকা পচা মাংস ধীরে ধীরে জলের তলদেশে জমা হতে লাগল। আটলাসের হাতে থাকা ট্রাইডেন্ট ধপ করে পড়ে গেল। পুরো আই অই অফ সাহারা কয়েকবার কেঁপে উঠল। সেই সাথে পেছন থেকে কিছু কণ্ঠস্বর ভেসে আসল, ‘ধন্যবাদ…!’
আই অফ সাহারা কয়েকবার কাঁপল, এরপর থেমে গেল। আই অফ সাহারা মাটি ধসে পড়েনি। এর মূল কারণ হলো হাজার বছর ধরে আটলাস আই অফ সাহারার ভার ধরে ছিল, ফলে সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর ভৌগলিক অবস্থা পরিবর্তন আই অফ সাহারাকে জড়িয়ে ধরেছে। আই অফ সাহারা মরুভূমির চাপে জলের উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এখন আর আটলাসের প্রয়োজন নেই।
ইওন ট্রাইডেন্ট হাতে তুলে নিলো। ইওনের পাশে ফারহান এসে দাঁড়াল। সে বলল, ‘এই ট্রাইডেন্টের বদলৌতে তুমি অতীতে ফিরে গেছিলে ফেডার উইল।’
ইওন মাথা নাড়াল, নেড়ে সে বলল, ‘এই ট্রাইডেন্ট তথা ত্রিশূল সাধারণ কোনো অস্ত্র নয়। ধাতু জলে অনেক দিন থাকলে মরিচা ধরে, ক্ষয় হতে থাকে। কিন্তু এই ত্রিশূল এখনো নতুন, চকচক করছে যেন সদ্য তৈরি ত্রিশূল। এই অস্ত্র এখানে ফেলে রেখে চলে যাওয়া ঠিক হবে না।’
_ “তাহলে তুমি নিয়ে নেও।’’ বলল ফারহান।
_ “আমার তো নিজের তলবারি রয়েছেই। এই অস্ত্র আমার কোন কাজের নয়। কিন্তু আপাতত আমার কাছে রাখছি। পরবর্তীতে যোগ্য কাউকে পেলে দিয়ে দেবো।’’
আই অফ সাহারার জলের নিচ থেকে উঠে এলো ফারহান এবং ইওন।
.
.
 দু'দিন পর
_ “দু'দিন তুমি মরুভূমি আমাকে দেখিয়েছ। ধুধু মরুভূমিতেও যে দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে তা আজ তোমার মাধ্যমে আমি জানতে পেরেছি।’’ বলল ফারহান।
ইওন ম্লান হাসল। ফারহান আবারও বলে উঠল, ‘ফেডার উইল, আমাকে তো নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। তুমিও আসো আমার সাথে। আমার সবুজ, শ্যামলা দেশ ঘুরে আসো। দেখ, না বললে না কিন্তু!’
_ “এই মরুভূমির বাহিরে আমি কখনো পা দেইনি। অনেকবার সুযোগ পেয়েছি কিন্তু যাইনি। আজ যেহেতু তুমি বলছ সেহেতু আমি যাব। ফেডার উইল তোমার কথা ফেলার সাহস রাখে না।’’
ফারহান নিজের ডানা বের করল সেই সাথে সে তার ক্ষমতা বলে ইওনের পিঠে কিছু সময়ের জন্যে দুটো ডানা দিলো। দু'জন আকাশের অনেক উপরে উঠল। এত উপরে উঠেছে যে নিচ থেকে কোনো মানুষ তাদের দেখতে ছোট্ট পাখি মনে করবে। দু'জন উড়াল দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের দিকে।
.
.
 তেরো ঘণ্টা পর তারা এসে বাংলাদেশে পৌঁছাল। মাঝ রাত তখন বাংলাদেশে, ফারহান আর ইওন ফারহানের ছাঁদে অবতরণ করল। ফারহান তার ঘরে নিয়ে আসলো ইওনকে।
ইওন ফারহানের অগুছালো রুম দেখে বলে উঠল, ‘ঘরে কী যুদ্ধ হয়েছিল নাকি?’
ফারহান এক গাল হাসল। হেসে সে বলল, ‘যাওয়ার আগে তিনটে খুন করেছিল। তারই নমুনা হলো এই অগুছালো ঘর।’
_ “তা তিনটে খুন করার কারণ?’’ প্রশ্ন করল ইওন।
_ “আগেও তো বলেছিলাম, চিরকুট আর চিরকুট দেওয়া লোকটাকে খুন করার কারণে খুনী তিনজনকে হত্যা করি।’’
_ “ওহ! হ্যাঁ।’’ অন্যমনস্ক হয়ে বলল ইওন।
ফারহান কিছুক্ষণ ইওনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর সে বলল, ‘অনেক যাবত তুমি কোন একটা বিষয় নিয়ে ভাবছ, চিন্তিত তুমি।’
_ “কী করে বুঝলে?’’ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করল ইওন।
_ “চোখের ভাষা বোঝার ক্ষমতা তোমার সাথে থাকতে থাকতে শিখে ফেলেছি।’’ হেসে বলল ফারহান।
ইওন কিছু বলল না। ফারহান আবারও বলে উঠল, ‘কী হয়েছে ফেডার উইল? এভাবে কী নিয়ে চিন্তা করছ?’
_ “আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আমরা বিরাট বড় একটা ভুল করেছি। বারবার কেন জানি মনে হচ্ছে প্রকৃতির কোন নিয়ম আমরা ভঙ্গ করেছি।’’ গম্ভীর গলায় বলল ইওন।
_ “আমার তো সব ঠিকঠাকই মনে হচ্ছে।’’ ঘাড় নাড়িয়ে ঠোঁট উচকিয়ে বলল ফারহান।
_ “একটু ভাবো তোমার সাথে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার সমাধান এখনো হয়নি।’’ জলদগম্ভীর গলায় বলল ইওন। ধীরে ধীরে ইওনের গম্ভীরতরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খুবই সিরিয়াস সে।
কিছুক্ষণ চুপ করে ফারহান ভাবতে লাগল। এরপর সে চোখ জোড়া বড় করে ইওনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঝড়..!’ ইওন মাথা নাড়ল। সে বলল, ‘হ্যাঁ! ঝড়। একবার ভেবে দেখো তুমি বঙ্গোপসাগরে ছিলে আচমকা একটা ঝড় তোমাকে নিয়ে আসে আই অফ সাহারাতে। বিষয়টা অদ্ভুত না? কে আনলো তোমাকে? আটলাস মৃত, আর পসাইডনের অভিশাপ অনুসারে প্রাণীটা জলের বাহিরে বের হতে পারবে না। আর তাছাড়া সে আটলাসের আশেপাশেই থাকবে যাতে কেউ আটলাসের দেহ নষ্ট করতে না পারে। সে কখনো তোমাকে গিয়ে আই অফ সাহারার নিকটে নিয়ে আসবে না। তাহলে তোমাকে কে নিয়ে গেল?’
_ “ঝড়টা আমাকে রাতারাতি আমার গন্তব্য নিয়ে যায়। ঝড় না থাকলে আমি আটলান্টিক মহাসাগরে যেতাম। ভুলেও মরুভূমির দিকে যেতাম না।’’ বলল ফারহান।
_ “এর অর্থ এমনটা হয়ে দাঁড়াল না যে কেউ একজন চেয়েছিল তুমি আই অফ সাহারাতে যাও। আমার সাথে মোলাকাত হোক, আমরা একসাথে মিলে প্রাণীটাকে হত্যা করি ,আটলাসের দেহটা ধ্বংস করি।’’ বলল ইওন।
_ “একদম ঠিক বলেছ। এক মিনিট এর মানে কী কেউ একজন…’’ ফারহান আর কিছু বলার আগেই ইওন তার হাতে থাকা ত্রিশূল দেখিয়ে বলল, ‘ঠিক ভেবেছ কেউ এই ত্রিশূলটা চায়। প্রাণীটাকে পরাজিত করার মতো ক্ষমতা হয়তো তার নেই, তাই আমাদের দিয়ে প্রাণীটাকে হত্যা করিয়েছে।’
_ “কিন্তু এখন অবধি তো কেউ আমাদের কাছ থেকে ত্রিশূলটা চুরি করার চেষ্টা করেনি।’’ বলল ফারহান।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ইওন বলল, ‘তবু আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
.
.
 তিনদিন কেটে গেল কিন্তু কোন অলৌকিক ঘটনা ঘটে নি। কেউ ত্রিশূল ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেনি। ইওন আর ফারহান বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে বঙ্গোপসাগরে ওঠা ঝড়টা হয়তো বিশেষ কোন ঝড় ছিল। তারা এটাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে কেউ তাদের আই অফ সাহারাতে নিয়ে যায়নি। ঝড়টা শ্রেফ একটা কাকতালীয় ঘটনা ছিল।

_ “সবুজ, শ্যামলা পরিবেশ কেমন লাগল?’’ প্রশ্ন করল ফারহান।
ফারহানের বাসার ছাঁদে উপর তারা দু'জন বসে আছে। ইওন আকাশের দিকে চেয়ে আছে তখনই ফারহান প্রশ্ন করে বসে।
ইওন প্রত্যুত্তরে বলল, ‘পীড়া দায়ক!’
_ “কেন?’’ ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করল ফারহান।
_ “যন্ত্রের শহর, গাছ-পালা তুলনামূলক কম। সারাদিন যন্ত্রের ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ। আর বায়ুটাও বেশ দূষিত।’’ উদাস হয়ে বলল ইওন।
ফারহান হেসে বলল, ‘মুদ্রার এপিঠ দেখেছ, চলো এবার ওপিঠ দেখে আসি।’
দ্রুত ফারহান ঘরে এসে ব্যাগ গুছিয়ে নিলো। ইওনকে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। রিকশায় তারা চড়ে বসল। রিকশায় ওঠে ইওন বলল, ‘এ চার পাইকায় করে আমাকে কোথায় নিয়ে চলেছ?’
_ “যন্ত্র মুক্ত ভিন্ন এক জগতে।’’ হেসে বলল ফারহান।
ঢাকা সদর ঘাটের সামনে এসে থামল রিকশা। ইওন রিকশা থেকে নেমে বলল, ‘এত মানুষ! এই স্থানে কেন?’
_ “সবই রহস্য!’’ বলল ফারহান।
ঢাকা টু চাঁদপুরগামী লঞ্চে ওঠে পড়ল ফারহান আর ইওন। ফারহান টিকেট কিনে ইওনকে নিয়ে ওপর। চলে আসলো। কিছুক্ষণ পর লঞ্চ ছেড়ে দিলো। সমুদ্রের শীতল হাওয়া উপভোগ করতে করতে সাড়ে তিন ঘণ্টা কেটে গেল। লঞ্চ থেকে নেমে গাড়িতে ওঠে পড়ল ফারহান আর ইওন।
_ “কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? এখনো তো চারিদিকে যন্ত্র।’’ বলল ইওন।
_ “উঁহু, আর দু'ঘণ্টা। এরপর যন্ত্রের মন্ত্র কেটে যাবে।’’ হেসে বলল ফারহান।
.
.
 আড়াই ঘণ্টা পর
_ “বাহ্! এ আমাকে কোথায় নিয়ে এলে? যেদিকে তাকাই শুধু সবুজ মাঠ আর মাঠ।’’ ইওন।
হাঁটতে হাঁটতে ইওন আর ফারহান একটা বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল। বাড়ির সামনে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দেখতে খুব সুন্দর। মেয়েটা ফারহানকে দেখতে ফারহানকে জড়িয়ে ধরল।
ইওন মনে মনে ভাবল, ‘মনে হয় ফারহানের সহধর্মিণী।’
_ “বাবা, তিন বছর পর তুমি বাড়ি ফিরেছ। এত বছর আমার কথা মনে পরেনি?’’ প্রশ্ন করল মেয়েটি।
ইওন মনে মনে ভাবল, ‘ওপস! এ দেখি ফারহানের মেয়ে। আমি কী ভাবলাম!’
ফারহান কিছু বলতে নিলো কিন্তু তার আগেই পাশের মাঠে বিশাল এক ঝড় উঠতে লাগল। দ্রুত সবাই বাড়ির ভেতর প্রবেশ করল। ইওন বাড়ির ভেতর যাওয়ার সময় লক্ষ্য করল ঝড়ের মধ্য থেকে যেন দুটো চোখ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

চলবে….