#Lost_City_Of_Atlantis
লেখক:#শাহরিয়ার_হাছান
পর্ব-১৩

বাহিরে প্রচুর ঝড় হচ্ছে, তীব্র বাতাস সেই সাথে বৃষ্টি। ফারহান তার মেয়ের সাথে আড্ডায় মত্ত। আর ইওন ঝড়ে দেখা দু'চোখ নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত। সে তার তলোয়ার সাথে আনেনি, না এনেছে ত্রিশূল। দুটোই ফারহানের শহরের বাড়িতে ফেলে রেখে চলে এসেছে। এর কারণ হলো তলোয়ার আর ত্রিশূল নিয়ে বের হলে মানুষ সন্দেহ করতে পারে, আবার পথে ঘাটে পুলিশ এসব দেখতে জেলেও ভরতে পারে।
_ “ফেডার উইল, কী হলো চুপ কেন?’’ ইওনের পিঠে চাপড় মেরে কথাটা বলল ফারহান।
ইওন মাথা ঝাকিয়ে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে সে বলল, ‘তা তোমার মেয়ে আছে বললে না যে?’
_ “আসলে বলা হয়নি। পরিবারের সবাই মারা গেছেন শুধু আমার মেয়েই বেঁচে আছে। কারণ তার মধ্যেও আমার মতো ক্ষমতা রয়েছে।’’ বলল ফারহান।
_ “ওহ! তা তোমার পরিবারের সবাই মারা গেল কিভাবে?’’ প্রশ্ন করল ইওন।
_ “সে এক লম্বা ইতিহাস। পরে কোন একদিন এক কাপ চায়ের আদলে বলব।’’ বলল ফারহান।
ইওন মাথা নাড়ল।
একটা কালো বর্ণের ঈগলের মতো দেখতে পাখি এসে ফারহানের মাথায় টোকা দিলো। ফারহান উপরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘বহুরূপী?’
পাখিটা একটা বিড়ালের রূপ নিয়ে ফারহানের কোলে খুব আয়েশ করে বসল। ইওন দৃশ্যটা দেখে চমকে গেল। ফারহান বলে উঠল, ‘যেই পোষা প্রাণীটার কথা আমি তোমাকে বলেছিলাম এটাই সেই প্রাণী। নিজের রূপ বদলাতে পারে।’
_ “অদ্ভুত!’’ বলল ইওন।
রাতে
খাওয়া দাওয়া শেষে ইওন ফারহানের রুমে গিয়ে বলল, ‘একটা কথা বলার ছিল।’
_ “কী?’’ উৎসুক জনতার মতো ভঙ্গী করে বলল ফারহান।
_ “আমরা যে ত্রিশূলটা ফেলে রেখে চলে এসেছি, এটা কী ঠিক করেছি?’’ প্রশ্ন করল ইওন।
ফারহান একটু ভেবে হেসে বলল, ‘এমন স্থানে লুকিয়েছি আমি ছাড়া অন্য কেউ অন্তত খুঁজে বের করতে পারবে না।’’
_ “বাগানে মাটির তলায় একটা কাঠের লম্বাটে বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছ। জানি আমি। তবুও একটা সন্দেহ তো লেগেই থাকে।’’ বলল ইওন।
_ “আচ্ছা! আগামীকাল বহুরূপীকে পাঠাব। সে গিয়ে দেখে আসবে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা।’’ মাথা চুলকিয়ে বলল ফারহান।
_ “আমরা যতদিন এখানে থাকছি ততদিন বহুরূপী ত্রিশূলের পাহাড়া দিক। আর অদ্ভুত কিছু ঘটলে বহুরূপী এসে জানিয়ে দেবে।’’ বলল ইওন।
_ “এতদিন পর এসেছি বহুরূপীকে এভাবে…’’ আর কিছু বলল না ফারহান। একটু ভেবে সে বলল, ‘আচ্ছা! তোমার কথা মতোই হবে সব।’’
.
.
_ “পুরো বাগানটা খুঁড়ে ফেলো।’’ দু'জন লোককে নির্দেশ দিলো আরিফ।
_ “বস, এখানে তিনটে মৃত দেহ মাটির নিচে পুতে রাখা হয়েছে।’’ বলল একজন।
_ “হতচ্ছাড়া আমি ত্রিশূল খুঁজতে বলেছি, মৃত দেহ না। এই বাগানে তিনটে মৃতদেহ পুতে রাখা হয়েছে তা আমি বেশ ভালো করেই জানি।’’ বলল আরিফ।
ঘণ্টাখানেক পর লোক দুটো ত্রিশূল খুঁজে পেল। ত্রিশূল তারা আরিফের নিকট হস্তান্তর করে দিলো। আর আরিফ ত্রিশূল নিয়ে ফারহানের ঘরের ভেতরে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ত্রিশূল হাতে দেখতে লাগল।
 _ “আমাকে কী আটলাসের মতো লাগছে?  নাকি পসাইডনের মতো?’’ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিজে দেখে কথাগুলো বলল আরিফ। আরিফের ডান হাতে একটা ত্রিশূল, আর বাম হাতে একটা রিভলবার। কিছুক্ষণ আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকল সে। এরপর সে আবারও বলে উঠল, ‘না! আমি না আটলাসের মতো দেখতে না পসাইডনের মতো দেখতে। আমি তো লম্বায় মাত্র ছয় ফুট। ওরা তো দৈর্ঘ্যে আমার চেয়ে কত লম্বা, তাছাড়া প্রস্থেও।’
রুমের দরজায় খিল মারা শব্দ পেয়ে আরিফ পেছনে তাকাল। দু'জন লোক তার ঘরে প্রবেশ করেছে। লোক দুটোর হাতে ছুরি। আরিফ বলে উঠল, ‘একি তোমরা কারা?’
ছুরি হাতে লোক দুটো আরিফের দিকে এগিয়ে এলো। এরপর হঠাৎ-ই তারা ফিক করে হেসে দিলো। দু'জন এক সাথে বলে উঠল আপনাকে খুন করতে এসেছি।  আরিফ হাসল, হেসে সে বলল, ‘ টাকা জন্যে এসেছ জানি আমি। ত্রিশূল চুরির প্রাপ্য টাকা এখনই আমি পরিশোধ করছি।’
এই বলে আরিফ ক্ষিপ্র গতিতে ত্রিশূল চালিয়ে লোক দুজনের বুক ফালাফালা করে দিলো।
মৃত দেহ দুটোর উপর ঝুঁকে সে বলল, ‘এভাবে কেউ টাকা চাইতে আসে? ছুরি হাতে? এমন অভদ্রতা করলে তো আমি শাস্তি দেবোই।’
.
.
 পরের দিন সকাল সকাল ফারহান বহুরূপীকে শহরে পাঠাল। বিকেলের দিকে বহুরূপী ফিরে আসলো। বহুরূপী ফিরেছে দেখে ইওন বুঝল ত্রিশূল চুরি হয়েছে।
_ “বাড়ির দরজা খোলা, বাগানের মাটিগুলো আলগা।’’ বলল বহুরূপী।
ইওন যা বুঝার বুঝে গেল। ফারহানকে সে বলল, ‘আমরা বের হওয়ার পরপরই ত্রিশূল চুরি হয়। নিশ্চিত আমি!’
_ “কিভাবে?’’ প্রশ্ন করল ফারহান।
_ “কারণ গতদিন যে ঝড়টা উঠেছিল সেই ঝড়ের মধ্যে আমি দুটো চোখ দেখেছিলাম। এই ঝড় ত্রিশূল দ্বারা তৈরি করা হয়েছে।’’ বলল ইওন।
_ “তাহলে আমাদের এখুনি শহরে ফিরে যেতে হবে।’’ বলল ফারহান।
_ “কিন্তু যে চুরি করেছে সে তো মনে হয় না নিজ থেকে ধরা দেবে। ভিন্ন কোন উপায় বের করতে হবে।’’ বলল ইওন।
_ “ওই লোকটাকে যারা হত্যা করেছিল তারা তিনজন ছিল। আমি তাদের হত্যা করেছিলাম। এখন তো মনে হচ্ছে তাদের অন্য কেউ পাঠিয়েছিল। তাহলে ওই লোকটার আসল খুনীকে খুঁজলে হয়তো আমরা জানতে পারব ত্রিশূলটা কে চুরি করেছে।’’ গম্ভীর গলায় বলল ফারহান।
মিনিট দুয়েক পর ফারহান আবারও বলে উঠল, ‘সব বুঝলাম কিন্তু বঙ্গোপসাগরে ঝড়টা কে উঠিয়েছিল?’ প্রত্যুত্তরে ইওন কিছু বলল না। সেও বুঝতে পারছে না কী সব যে হচ্ছে!
.
.
 পরের দিন
শহরে ফিরে এলো তারা। বছর খানেক আগে ঘটে যাওয়া সেই খুন সম্পর্কে ফারহান অনেক তথ্যই সংগ্রহ করেছিল। সবকিছু তার ঘরের ড্রয়ারে রয়েছে। সেগুলো আবার পুনরায় শুদ্ধি পরীক্ষা করতে হবে। যে সকল প্রমাণ পরীক্ষায় টিকবে না সেগুলো বাদে বাকি প্রমাণ নিয়ে আবারও তারা খুনীদের খুঁজতে বেরিয়ে পড়বে।
সারাদিন ভরে তারা পূর্বের প্রমাণগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগল। এভাবে আরো দু'দিন পর হয়ে গেল। আজ তারা লোকটার বাড়ির একটা ঠিকানা সংগ্রহ করতে পেরেছে। ঠিকানাটা সঠিক কিনা তা তারা জানে না। কিন্তু তবুও একবার গিয়ে তারা দেখে আসতে চায়।
.
.
_ “ঠিকানা তো আমার বাড়ি থেকে মিনিট দশেক দূরের। লোকটা আমার বাড়ির এত কাছে থাকত আর আমি জানতাম না।’’ বলল ফারহান।
ঠিকানা অনুসারে পৌঁছাল ইওন আর ফারহান। ভাঙ্গা পুরোনো আমলের একটা বাড়ি। বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতেই ফারহান থমকে দাঁড়াল। পুরো ঘর জুড়ে মহাজাগতিক প্রাণীদের ছবি। আটলাস, পসাইডন, ফারহান এবং ইওনের ছবি। ফারহানের প্রতিটা ছবিতেই সে মহাজাগতিক রূপে রয়েছে। ফারহান কয়েকটা ছবি হতে নিয়ে বলল, ‘এ তো আমার অনেক বছর আগের ছবি। লোকটা তাহলে আমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানত।’
ইওন আচমকা চিৎকার দিয়ে ফারহানকে ডাকল। বাড়ির দ্বিতীয় তলায় উঠেছে ইওন। ফারহান কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। ইওন হাতের ইশারায় কিছু ছবির দেখার জন্যে ফারহানকে ইশারার করল। ফারহান ছবিগুলো দেখে থমকে দাঁড়াল।
_ “এবার বুঝেছি বঙ্গোপসাগরে ঝড় কে তুলেছিল।’’ কাঁপা গলায় বলল ফারহান।
ইওন গম্ভীর গলায় বলে উঠল, ‘একটা বিষয় আমরা শুরুতে খেয়াল করিনি। করলে হয়তো আগেই বুঝে যেতাম অন্য কেউ রয়েছে এর পেছনে।’
_ “কোন বিষয়?’’ প্রশ্ন করল ফারহান।
ইওন ফারহানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘শিপ এ.কে.সেভেন আটলান্টিক মহাসাগরের চলে। আর আই অফ সাহারাতে বন্দি ছিল সেই প্রাণীটা। সেই প্রাণীটা কখনই শিপ এ.কে.সেভেনের নাবিকদের জলে টেনে নিয়ে যেতে পারবে না, না সে তাদের রুহ বন্দি করতে পারবে। এর পেছনে হাত ছিল..’’
ইওন আর কিছু বলতে পারল না। এক দৃষ্টিতে সে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর ফারহান বলে উঠল, ‘আটলাস…’