#Lost_City_Of_Atlantis
লেখক:শাহরিয়ার_হাছান
পর্ব-৩
রবার্টকে পুরোপুরি সুস্থ হতে দু’দিন সময় লাগল। এই দু’দিন চার্লস রবার্টকে সমুদ্রে নাবিকের সাথে ঘটা কোন ঘটনাই বলেনি। ঘন্টাখানেক হলো চার্লস রবার্টকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে। রবার্ট আর ধৈর্য্য ধরতে পারল না, সে চার্লসকে জিজ্ঞেস করল, “ভাই ওদিন নাবিকের সাথে কী হয়েছিল?’
_ “ ঠিক ক্যাপ্টেন জুলবার্গের মতো নাবিকটা সমুদ্রের পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। এরপর আচমকা ঝড় উঠে তারপর থেকেই তার আর কোনো হদিস মিলছে না। কয়েকজন নাবিক বলছে সে নাকি স্বেচ্ছায় পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিল। এই দু’দিন সমুদ্রে খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে কিন্তু নাবিকের লাশ পাওয়া যায়নি। এত বিরাট সমুদ্রে লাশ পাওয়াও দুষ্কর। তাছাড়া কর্তৃপক্ষ একটা লাশের জন্যে মোটা অঙ্কের অর্থও ব্যয় করতে নারাজ। তাই খোঁজাখুজির কাজ আপাতত বন্ধ।’’
চার্লসের সব কথা শুনে রবার্ট বলল, ‘এর মানে নাবিকের গায়েব হওয়ার পেছনে সমুদ্রের ঝড়ের কোন না কোন যোগসূত্র রয়েছে।’
_ “মনে হয় পানির নিচে থাকা আদিম দেবতারা আবার জেগে উঠেছে। আর তারা তাদের ক্ষুধা মেটাতে ঝড় তোলে এবং সেই ঝড়ের সাথে নাবিকদের নিয়ে যায়।’’
চার্লস ভেবেছিল তার কথা শুনে রবার্ট হেসে উঠবে কিন্তু তা হলো না। বরং রবার্ট চার্লসের কথাটা খুব গুরুত্ব সহকারে নিলো। রবার্ট বলে উঠল, ‘হতে পারে অন্য মাত্রার কোন প্রাণী এসব করছে।’
_ “দেখ, মাত্রা সম্পর্কে আমারও কিছুটা ধারণা রয়েছে কিন্তু এটা সম্ভব নয়। এগুলো শুধু ধারণা মাত্র। আমি তো তোমাকে হাসাতে বলেছিলাম আদিম দেবতারা মনে হয় জেগে উঠেছে।’’
_ “রহস্যটা উদঘাটন করা প্রয়োজন। এভাবে আর কত নাবিক মারা যাবে কে জানে! এর একটা সুরাহা তো বের করতেই হবে। ক্যাপ্টেন হয়তো এই প্রাণীটার সম্পর্কে সবকিছু জানতে। তিনি বেঁচে থাকলে আমরা তার কাছ থেকে সাহায্য নিতে পারতাম। কিন্তু তিনিও সেই প্রাণীর শিকারে পরিণত হন।’’ মন মরা হয়ে বলল রবার্ট।
_ “তবে একটা উপায় আছে এই রহস্য উদঘাটনের। সেটা হলো আমাদের সেই রুটের জাহাজে আবারও কাজ নিতে হবে। তবে এতে প্রাণ নাশের আশঙ্কা রয়েছে। এমনও হতে পারে আমরা সব জানার পর মারা পড়ব। হয়তো এই রহস্য পৃথিবী বাসীকে জানাতে ব্যর্থ হবো। আমাদের মতো পরবর্তীতে যারা এই রহস্য উদঘাটন করতে আসবে তারাও হয়তো মারা পড়বে।’’ গম্ভীর গলায় বলল চার্লস।
_ “না, আমাদের মরলে চলবে না। সেই প্রাণীটাকে মারতে হবে। এভাবে শুরুতেই হার মেনে নিলে চলবে না। চেষ্টা চালাতে হবে।’’ জোড় গলায় বলল রবার্ট।
_ “যে প্রাণীটা ঝড় তুলতে পারে, সে প্রাণীটার ক্ষমতা কত দূর হতে পারে নিশ্চয়ই অনুমানও করতে পারছ। আমরা তো সাধারন একটা ঝড়ের মোকাবেলাই করতে পারব না। তো ওই মহাজাগতিক প্রাণীর সাথে কিভাবে লড়াই করব? তাছাড়া আমরা জানিও না এটা কোনো প্রাণী করছে না প্রকৃতি। আমি তো বলি এসবের থেকে আমরা দূরে থাকলেই আমাদের জন্যে মঙ্গল হবে।’’ বলল চার্লস।
রবার্ট আর কিছু বলল না। সম্মতিসূচক উপর থেকে নিচে সে মাথা নাড়ল। চার্লসের কথায় যুক্তি রয়েছে, প্রাণীটা সম্পর্কে না জেনে কোন পদক্ষেপ নেওয়াটা বোকামি হবে।
.
.
এদিকে ফারহান খুনীদের ধরার জন্য একটা ফন্দি করেছে। সে প্রথমে পুলিশকে বলে যে লোকটাকে মৃত্যুর পূর্বে সে দেখেছে। এরপর আশেপাশের প্রতিবেশীদেরও একই কথা বলে। তার বিশ্বাস এতে খুনিরা কাগজের বাকি অংশটুকু নেওয়ার জন্য তার উপর আক্রমণ করবে। আর ফারহান নিজের বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে তাদেরকে ধরে ফেলবে। অবশ্য এ কাজে সে তার অধ্যাতিক ক্ষমতাগুলো কাজে লাগাতে পারে কিন্তু তা সে করবে না। অধ্যাতিক ক্ষমতা বলতে ফারহান সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু ব্যতিক্রম। এলাকাবাসীদের কাছে সে রহস্যময়। কেউ এখনো তার পরিচয় জানতে পারেনি। শুধু সবাই নামটাই জানে। অনেকে তো এটাও মনে করে যে ফারহান কালো জাদু করে।
.
.
একটা ছুরি হাতে রুমে ফারহান পায়চারি করছে। এই ক'দিন সে পুরো এলাকায় সেদিনের ঘটা ঘটনা ছড়িয়েছে, তবে কাগজের টুকরোর কথা সে কাউকে বলেনি। আচমকা সে রুমের এক কোণে থাকা টেবিলের ড্রয়ারে খুলে তাকিয়ে রইল। ড্রয়ারে একটা কালো তরল পদার্থে পরিপূর্ণ শিশি রয়েছে। সে শিশির মুখ খুলে ভেতরে থাকা তরল পদার্থ এক ঢোঁকে খেয়ে ফেলল। সাথে সাথে তার সারা শরীর হালকা কেঁপে উঠল।
রাত তখন বারোটা বাজে। ফারহানের চোখে রাজ্যের ঘুম বাসা বেঁধেছে। আজ না ঘুমালে মোট তিন রাত সে না ঘুমিয়ে। ফারহান বিছানায় গা এলিয়ে দিলো, ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ তার কানে ভেসে এলো। সে লাফিয়ে উঠে বসল। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। যেন দরজার ওপাশে থাকা ব্যক্তিটা এখনই দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করবে। ফারহান বুঝতে পাড়ল নিশ্চয়ই খুনীরা এসেছে। সে উঠে গিয়ে ড্রয়ার থেকে রিভলবারটা হাতে নিয়ে নিলো। এদিকে দরজা ভেঙ্গে তিনজন লোক ভেতরে প্রবেশ করল। ফারহান তাদের দিকে রিভলবারটা তাক করল। সে ট্রিগারে চাপ দিতে নিলো কিন্তু হঠাৎ পেছন থেকে জোরালো কিছু একটা দিয়ে কেউ তার মাথায় আঘাত করল। সে মাটিতে লুটিয়ে পরল।
.
.
জ্ঞান ফিরতেই ফারহান নিজেকে চেয়ারের সাথে বাধা অবস্থায় পেলো। মনে মনে সে নিজেকে প্রশ্ন করল, ‘ছবি, সিনেমা, গল্প, বাস্তব সব জায়গায় চেয়ারের সাথে কেন বাঁধে? আর কিছু কী নেই এই দুনিয়াতে?’
চড় খেয়ে ফারহান ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো। সামনে থাকা ব্যক্তিটা তাকে চড় মেরেছে। সে স্থির দৃষ্টিতে লোকটার দিয়ে তাকিয়ে রইল। লোকটা বলে উঠল, ‘কাগজের বাকি অংশটুকু কোথায়?’
ফারহান একটু হাসল, হেসে সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‘কাগজের নিচের অংশটা কোথায়? এখুনি দিয়ে দেও, নইলে তোমাদের মরতে হবে।’
লোকটা রেগে গিয়ে ফারহানকে আঘাত করতে লাগল। আচমকা বাহিরে মুষুলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। সেই সাথে কান ফাটানো বজ্রপাতের শব্দ। লোকটা থেমে গেল। আচমকা প্রকৃতির এরূপ পরিবর্তন দেখে লোকটা কিছুটা ভয় পেয়েছে, সেই সাথে লোকটার সাথে থাকা বাকি তিনজনও। হুট করে কারেন্ট চলে গেল। পুরো রুমে এখন ঘুট্ঘুটে অন্ধকার বিরাজ করছে। লোকটা তার ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে সামনে বাধা অবস্থায় থাকা ফারহানের দিকে ফেলল। একটা মৃদু আর্তনাদ তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো। তার সামনে তারই সাথে আসা একটা ছেলের মৃত দেহ পড়ে আছে। ছেলেটার ঠিক বাম পাশে ছুরি গেঁথে আছে, ঠিক হৃৎপিণ্ড বরাবর। লোকটা কিছুটা ভয় পেল। পেছন ফিরে টর্চ মারতেই সে থমকে দাঁড়াল। তার সাথে আসা সবাই মৃত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। এত দ্রুত নিঃশব্দে তিনটে খুন কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে করা অসম্ভব। কিন্তু কাজটা ফারহান নিখুঁতভাবে করেছে।
অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ফারহান লোকটার গলা চেপে ধরল। সে বলল, ‘অন্ধকারে বিড়ালও এতটা ভালো দেখে না যতটা ভালো আমি দেখি। কাগজের বাকি অংশটুকু আমার নিকট হস্তান্তর করেন, নইলে আপনার মৃত্যুর জন্য আপনিই দায় থাকবে। আপনার জীবনের মূল্য শুধু মাত্র ওই কাগজের টুকরোটাই পরিষদ করতে পারবে।’
লোকটা পকেট থেকে একটা কাগজের টুকরো বের করে ফারহানের দিকে এগিয়ে দিলো। ফারহান কাগজের টুকরোটা নিয়ে লোকটার গলা ছেড়ে দিলো। লোকটা প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে লাগল। ফারহান আড় চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘প্রাণ ভরে শ্বাস নেন, হতে পারে একটু পর শেষ নিঃশ্বাসও ত্যাগ করার সুযোগ পাবেন না।’
ফারহানের কথা শুনে লোকটা বড় বড় চোখে তার দিকে তাকালো।
.
.
ভোর হয়েছে এসেছে। ফারহানের ঘরে চারটে মৃত দেহ পড়ে আছে। ফারহান এক রাশ বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘এই চারটে লাশ আমি হ্যালোজেনে ডুবাব। শুধু শুধু রক্ত দিয়ে ওরা আমার ঘরটা নোংরা করে দিয়েছে। আবার এই লাশগুলোও ফেলে আসতে হবে। ঝামেলা!’
জানলার দিকে তাকাতেই তার চোখ কপালে উঠল। জানলাটা ভাঙা! এবার সে বুঝেছে, খুনীদের মধ্য থেকে একজন জানলা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে তার মাথায় আঘাত করে।
ফারহান খুনীদের থেকে নেওয়া কাগজের বাকি অংশটুকু মেলে ধরল। কাগজের টুকরোর মধ্যে দুটো ছবি সে পেলো। একটা ছবিতে পানির নিচে থাকা ধ্বংস প্রসাদের ছবি ছিল। অপর আরেকটি ছবিতে দেখে তার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। বিদঘুটে বিচ্ছিরি এক প্রাণীর ছবি। কাগজের লিখাটায় সে চোখ বুলাল। কাগজের লিখা সে পড়তে লাগল।
_ “প্রসাদের নিচে বন্দি ছিল এই বিচ্ছিরি প্রাণীটা। এখন এটা মুক্ত হয়ে গেছে। মহাজাগতিক এই প্রাণী আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে বাস করছে। মাঝে মধ্যে প্রাণীটা সমুদ্রে ঝড় তুলে, সেই ঝড়ের সাথে নিয়ে যায় জাহাজে কর্মরত কোনো নাবিককে। তার প্রধান খাদ্যই হলো মানব দেহে নিয়ন্ত্রণকারী রুহ!’’
ফারহান এগুলো পড়তে থমকে গেল। এসব কী! প্রাণীটার ছবি সে আরেকবার দেখে নিলো। এবার মনোযোগ সহকারে দেখার পর তার কাছে কেন জানি প্রাণীটা খুব চেনা লাগল।
.
.
প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর ইওন চোখের মতো জায়গাটায় পৌঁছাল। জায়গাটা সে ভালো করে দেখল। পুরো একটা চোখের মতো দেখতে। নির্জীব চোখ, প্রকৃতির বুকে গড়ে ওটা বিস্ময়কর এক দৃশ্য। চোখটা মানব চক্ষুর মতো নয়। দৃষ্টিহীন প্রাকৃতিক চোখ। মোট ছয়টি রিং দিয়ে গঠিত এই চোখ। বালির প্রতিটি রিং এর মাঝটা পানিতে পরিপূর্ণ। মাঝের রিংটি চোখের মণির মতো দেখায়। যেন নীলচে বাদামি মণির এক কৃত্রিম চোখ মহাবিশ্বের কোন এক স্থানের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ইওন কিছুটা অবাক হলো। প্রাকৃতিক ভাবে এমন আকৃতি তৈরি হওয়া কী আদৌও সম্ভব? নাকি মানব সৃষ্ট? হাজার বছর পূর্বে কোনো এক অজানা সভ্যতার মানুষ এটি তৈরি করেনি তো?
যাই হোক, ইওন মাথা থেকে প্রশ্ন ঝেড়ে ফেলে দিলো। কিছু পরিমাণ পানি সে পান করল। সেই সাথে সে তার উটকেও পানি পান করাল। আচমকা ইওনের মনে একটা কৌতুহল বাঁধল। চোখের মতো দেখতে এই জায়গার মাঝে যেতে তার খুব ইচ্ছে করছে। মাঝের অংশটা মণির মতো দেখতে। সেই দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালে হয়তো সে অদ্ভুত কিছু একটা দেখতে পারবে, এই আশায় ইওন চোখের মতো দেখতে জায়গাটির মাঝের দিকে যেতে লাগল।
চলবে….
গল্প বলা চোখটি আসলেই সাহারা মরুভূমির মাঝে রয়েছে। বিশ্বাস না হলে গুগল ম্যাপে আই অফ সাহারা(ইংরেজিতে) লিখে সার্চ দেন। অথবা আমার কমেন্টটি দেখুন।

0 Comments